০৮:৫৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬
টঙ্গীর ফ্লাইওভারে দাউদাউ আগুনে পুড়ল চলন্ত গাড়ি, আতঙ্কে থমকে গেল ব্যস্ত সড়ক ভোটের টানে ঘরে ফিরতে মরিয়া বঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকরা, ভয়ের ছায়া নাম কাটার আতঙ্ক আসামে ভোটের আগে কংগ্রেসের ‘পাঁচ গ্যারান্টি’, ১০০ দিনে জুবিন গার্গ হত্যার বিচার প্রতিশ্রুতি পাকিস্তানের বিশ্বস্বীকৃতি: ভারতের পররাষ্ট্রনীতির বড় ব্যর্থতা—জয়রাম রমেশের তীব্র আক্রমণ ভারতীয় রাজনীতিতে বড় চাল, বাংলায় ২৮৪ প্রার্থী ঘোষণা কংগ্রেসের—হেভিওয়েটদের নামেই জমল লড়াই সব আসনে ‘আমি-ই প্রার্থী’ বার্তা মমতার, ভোটের আগে আবেগঘন প্রচার তৃণমূলের সাত মাসে ব্যাংক থেকে ৭৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ বাড্ডায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল যুবকের, ইউ-লুপ ব্রিজে মর্মান্তিক সংঘর্ষ সুন্দরবনে শুরু হচ্ছে মধু সংগ্রহ মৌসুম: জীবনঝুঁকি, চাঁদাবাজি আর লক্ষ্যমাত্রার চাপ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে অগ্রগতি থমকে: অর্থায়ন ও নীতিগত ঘাটতিতে ঝুঁকিতে জলবায়ুপ্রবণ অঞ্চল

ইরান যুদ্ধ ঘিরে ট্রাম্প শিবিরে গভীর বিভাজন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সিদ্ধান্ত তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অনেক পুরোনো মিত্রদের সঙ্গে চূড়ান্ত বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে। একই সঙ্গে এটি তার রাজনৈতিক আন্দোলনের ভেতরেও বড় ধরনের বিভক্তি তৈরি করেছে। এই সিদ্ধান্তের প্রভাব ভবিষ্যতে ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারীদের ওপরও পড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার এক সপ্তাহের মধ্যেই ওয়াশিংটনে এ যুদ্ধকে ঘিরে স্পষ্ট রাজনৈতিক বিভাজন দেখা গেছে। রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট এমন একটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে, যাতে কংগ্রেসের হাতে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হতো। জনমতও দলভিত্তিকভাবে বিভক্ত। একটি জরিপে দেখা গেছে, রিপাবলিকানদের ৭৭ শতাংশ এই যুদ্ধকে সমর্থন করছে, যেখানে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে সমর্থন মাত্র ১৮ শতাংশ।

Iran War: Trump Rejects Peace Talks, MAGA Splits on US-Israel Military  Action - Bloomberg

ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরের দ্বন্দ্ব

রাজনৈতিক বিতর্কের আড়ালে এই যুদ্ধ ট্রাম্প প্রশাসন ও তার রাজনৈতিক জোটের ভেতরের অসঙ্গতিগুলোও সামনে এনে দিয়েছে। হামলার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ট্রাম্প ও তার কর্মকর্তারা ভিন্ন ভিন্ন যুক্তি দিয়েছেন।

ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান এমন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল যা যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম। অন্যদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র মূলত ইসরায়েলের একটি পরিকল্পিত হামলায় যোগ দিয়েছে, যা যেকোনো অবস্থাতেই ঘটতে যাচ্ছিল।

যুদ্ধ কতদিন চলবে এবং কী হলে এটিকে বিজয় বলা যাবে—এ নিয়েও প্রশাসনের ভেতরে ভিন্ন মত দেখা গেছে। ট্রাম্প বলেছেন, প্রয়োজন হলে যুদ্ধ অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে এবং ইরানকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে হবে। তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জনগণকে আশ্বস্ত করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র কোনো দীর্ঘমেয়াদি ও অনির্দিষ্ট যুদ্ধের দিকে যাবে না।

Trump’s cabinet is less hawkish. Will that affect his Israel-Iran response?

বিরোধপূর্ণ মতের এক জোট

ট্রাম্পের রাজনৈতিক জোট বেশ বিস্তৃত এবং ভিন্ন মতের মানুষ এতে যুক্ত। যুদ্ধের আগে তিনি যেমন ফিলিস্তিনপন্থী মন্তব্যের জন্য পরিচিত টাকার কার্লসনের পরামর্শ নিয়েছেন, তেমনি ইসরায়েলপন্থী কট্টর যুদ্ধসমর্থক সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন।

তার মন্ত্রিসভাতেও এমন বৈপরীত্য স্পষ্ট। জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে ট্রাম্প ব্যয়বহুল ও অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধের নীতি বন্ধ করবেন। আবার যুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী পিট হেগসেথ তার বক্তৃতায় প্রায়ই শত্রুদের বিরুদ্ধে ‘মৃত্যু ও ধ্বংস’ ডেকে আনার হুমকি দেন এবং আমেরিকার শক্তি ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দেন।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এসব মতভেদ আর কেবল কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিশেষ করে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স এবং প্রশাসনের বাকি অংশের মধ্যে পার্থক্য সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

লী পেনকে দোষী সাব্যস্ত করা 'এটা গণতন্ত্র নয়' : মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট |  আন্তর্জাতিক | বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)

যুদ্ধের শুরুতে ভ্যান্স কোথায় ছিলেন

২০২৪ সালে এক সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ হলো ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে না জড়ানো। তার মতে, এমন যুদ্ধ দেশের সম্পদ অপচয় করবে এবং অর্থনৈতিকভাবে বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

মেরিন কোরের সাবেক সদস্য ভ্যান্স তার রাজনৈতিক অবস্থান গড়ে তুলেছিলেন মূলত দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যায় বেশি মনোযোগ দেওয়ার পক্ষে। তিনি ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়েও রিপাবলিকানদের মধ্যে অন্যতম কড়া সমালোচক ছিলেন। ২০২৩ সালে তিনি ট্রাম্পকে সমর্থন জানিয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন, যেখানে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে নতুন যুদ্ধ শুরু না করার বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন।

কিন্তু ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ভ্যান্স প্রথম তিন দিন প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্য দেননি। শুধু হোয়াইট হাউস থেকে প্রকাশিত কিছু ছবিতে তাকে দেখা যায়, যা তার বিচ্ছিন্নতার গুঞ্জন আরও বাড়িয়ে দেয়।

একটি ছবিতে দেখা যায় ট্রাম্প ফ্লোরিডার মার-এ-লাগোতে অস্থায়ী পরিস্থিতি কক্ষ থেকে ইরানে হামলা পর্যবেক্ষণ করছেন, পাশে রয়েছেন রুবিও ও সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ। আরেক ছবিতে ভ্যান্সকে হোয়াইট হাউসে বসে যুদ্ধ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে দেখা যায়, যেখানে তার সঙ্গে ছিলেন গ্যাবার্ড, অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এবং জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট।

অবশেষে যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রায় দুই দিন পর ভ্যান্স প্রকাশ্যে এসে বলেন, প্রেসিডেন্ট স্পষ্টভাবে তার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্র কোনো দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের দিকে যাবে না।

ভোট দিলেন রিপাবলিকান পার্টির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স

রুবিওর প্রভাব বাড়ছে

ইরান যুদ্ধের প্রসঙ্গে ভ্যান্সের অবস্থান পরিবর্তন তার রাজনৈতিক অবস্থানের সাম্প্রতিক কয়েকটি পরাজয়ের ধারাবাহিকতা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

তিনি ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন বন্ধ করার দাবি তুলেছিলেন এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে হোয়াইট হাউসে সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু পরে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক সহায়তা দেওয়া অব্যাহত রেখেছে।

একসময় তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পুরো পৃথিবীর পুলিশ হয়ে ওঠা উচিত নয়। কিন্তু ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার নির্দেশ দিলে সেখানেও ভ্যান্স নীরব ছিলেন।

এই সব ঘটনায় ট্রাম্প বরাবরই রুবিওর অবস্থানকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। অথচ নির্বাচনের রাতে ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি নতুন কোনো যুদ্ধ শুরু করবেন না বরং বিদ্যমান যুদ্ধ বন্ধ করার চেষ্টা করবেন।

এদিকে প্রশাসনের ভেতরে রুবিওর প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। ২০২৫ সালে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে ট্রাম্প ভ্যান্সকে পাঠালেও ২০২৬ সালে সেখানে আরও সূক্ষ্ম বার্তা নিয়ে রুবিওকে পাঠানো হয়।

ইরানে প্রথম মার্কিন হামলার চার দিন আগে কংগ্রেসে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প প্রকাশ্যে রুবিওর প্রশংসা করেন এবং তাকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেও উল্লেখ করেন।

ইরান সম্পর্কে কংগ্রেসকে ব্রিফ করবেন মার্কো রুবিও - বাংলাদেশ টাইমস

স্থলযুদ্ধের প্রশ্নে মতভেদ

যুদ্ধ কীভাবে এগোবে তা নিয়েও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পিট হেগসেথ ও রুবিওর মধ্যে ইরানে স্থলবাহিনী পাঠানো নিয়ে তীব্র বিতর্ক হয়েছে। সেখানে হেগসেথ স্থল আক্রমণের পক্ষে থাকলেও রুবিও ঝুঁকি বিবেচনায় তুলনামূলক সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।

পেন্টাগন অবশ্য এ ধরনের খবরকে সম্পূর্ণ ভুয়া বলে দাবি করেছে। পররাষ্ট্র দপ্তর এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

তবে এমন খবর ফাঁস হওয়াই ইঙ্গিত দেয় যে ওয়াশিংটনে বার্তা ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের শৃঙ্খলাহীনতা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের সময় সাধারণত একক অবস্থান বজায় রাখা জরুরি হলেও ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্য ও সময়সূচি তুলে ধরছেন।

এক সাবেক মার্কিন কূটনীতিক মন্তব্য করেছেন, পুরো অভিযানটি অনেকটা তাৎক্ষণিকভাবে নেওয়া সিদ্ধান্তের মতো মনে হচ্ছে, যেন এক সকালে উঠে হঠাৎ যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

Tensions soar as Hegseth and Rubio feud over US troops in Iran | Middle  East Eye

রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন

এই যুদ্ধ এখন ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিটি সদস্যের রাজনৈতিক ভাগ্যের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়, দ্রুত বিজয় না আসে বা ইরানের সরকার ক্ষমতায় থেকেই যায়, তবে তা ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি ও তার পুরো প্রশাসনের জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে।

বিশেষ করে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের জন্য এটি বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। যদিও ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান মনোনয়নের অন্যতম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তাকে দেখা হচ্ছে, তবুও সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত অপেক্ষা করছে।

তিনি যদি নিজের দীর্ঘদিনের যুদ্ধবিরোধী অবস্থানে অটল থাকেন, তবে ট্রাম্পের সমর্থন হারানোর ঝুঁকি থাকবে। আবার ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করলে তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ সমর্থকদের একটি অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।

ইতিমধ্যে ভ্যান্সের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত কিছু বিশ্লেষকও ইরান যুদ্ধ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ এটিকে অত্যন্ত নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ পদক্ষেপ বলেও মন্তব্য করেছেন। কিছু জরিপেও দেখা গেছে, ট্রাম্প সমর্থকদের মধ্যেও এ যুদ্ধ নিয়ে দ্বিধা রয়েছে। এক জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৪৫ শতাংশ রিপাবলিকান ভোটার হয় হামলার বিরোধিতা করেছেন, নয়তো এ বিষয়ে মত দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

টঙ্গীর ফ্লাইওভারে দাউদাউ আগুনে পুড়ল চলন্ত গাড়ি, আতঙ্কে থমকে গেল ব্যস্ত সড়ক

ইরান যুদ্ধ ঘিরে ট্রাম্প শিবিরে গভীর বিভাজন

০৩:৪০:০৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সিদ্ধান্ত তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অনেক পুরোনো মিত্রদের সঙ্গে চূড়ান্ত বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে। একই সঙ্গে এটি তার রাজনৈতিক আন্দোলনের ভেতরেও বড় ধরনের বিভক্তি তৈরি করেছে। এই সিদ্ধান্তের প্রভাব ভবিষ্যতে ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারীদের ওপরও পড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার এক সপ্তাহের মধ্যেই ওয়াশিংটনে এ যুদ্ধকে ঘিরে স্পষ্ট রাজনৈতিক বিভাজন দেখা গেছে। রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট এমন একটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে, যাতে কংগ্রেসের হাতে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হতো। জনমতও দলভিত্তিকভাবে বিভক্ত। একটি জরিপে দেখা গেছে, রিপাবলিকানদের ৭৭ শতাংশ এই যুদ্ধকে সমর্থন করছে, যেখানে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে সমর্থন মাত্র ১৮ শতাংশ।

Iran War: Trump Rejects Peace Talks, MAGA Splits on US-Israel Military  Action - Bloomberg

ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরের দ্বন্দ্ব

রাজনৈতিক বিতর্কের আড়ালে এই যুদ্ধ ট্রাম্প প্রশাসন ও তার রাজনৈতিক জোটের ভেতরের অসঙ্গতিগুলোও সামনে এনে দিয়েছে। হামলার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ট্রাম্প ও তার কর্মকর্তারা ভিন্ন ভিন্ন যুক্তি দিয়েছেন।

ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান এমন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল যা যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম। অন্যদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র মূলত ইসরায়েলের একটি পরিকল্পিত হামলায় যোগ দিয়েছে, যা যেকোনো অবস্থাতেই ঘটতে যাচ্ছিল।

যুদ্ধ কতদিন চলবে এবং কী হলে এটিকে বিজয় বলা যাবে—এ নিয়েও প্রশাসনের ভেতরে ভিন্ন মত দেখা গেছে। ট্রাম্প বলেছেন, প্রয়োজন হলে যুদ্ধ অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে এবং ইরানকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে হবে। তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জনগণকে আশ্বস্ত করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র কোনো দীর্ঘমেয়াদি ও অনির্দিষ্ট যুদ্ধের দিকে যাবে না।

Trump’s cabinet is less hawkish. Will that affect his Israel-Iran response?

বিরোধপূর্ণ মতের এক জোট

ট্রাম্পের রাজনৈতিক জোট বেশ বিস্তৃত এবং ভিন্ন মতের মানুষ এতে যুক্ত। যুদ্ধের আগে তিনি যেমন ফিলিস্তিনপন্থী মন্তব্যের জন্য পরিচিত টাকার কার্লসনের পরামর্শ নিয়েছেন, তেমনি ইসরায়েলপন্থী কট্টর যুদ্ধসমর্থক সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন।

তার মন্ত্রিসভাতেও এমন বৈপরীত্য স্পষ্ট। জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে ট্রাম্প ব্যয়বহুল ও অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধের নীতি বন্ধ করবেন। আবার যুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী পিট হেগসেথ তার বক্তৃতায় প্রায়ই শত্রুদের বিরুদ্ধে ‘মৃত্যু ও ধ্বংস’ ডেকে আনার হুমকি দেন এবং আমেরিকার শক্তি ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দেন।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এসব মতভেদ আর কেবল কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিশেষ করে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স এবং প্রশাসনের বাকি অংশের মধ্যে পার্থক্য সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

লী পেনকে দোষী সাব্যস্ত করা 'এটা গণতন্ত্র নয়' : মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট |  আন্তর্জাতিক | বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)

যুদ্ধের শুরুতে ভ্যান্স কোথায় ছিলেন

২০২৪ সালে এক সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ হলো ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে না জড়ানো। তার মতে, এমন যুদ্ধ দেশের সম্পদ অপচয় করবে এবং অর্থনৈতিকভাবে বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

মেরিন কোরের সাবেক সদস্য ভ্যান্স তার রাজনৈতিক অবস্থান গড়ে তুলেছিলেন মূলত দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যায় বেশি মনোযোগ দেওয়ার পক্ষে। তিনি ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়েও রিপাবলিকানদের মধ্যে অন্যতম কড়া সমালোচক ছিলেন। ২০২৩ সালে তিনি ট্রাম্পকে সমর্থন জানিয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন, যেখানে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে নতুন যুদ্ধ শুরু না করার বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন।

কিন্তু ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ভ্যান্স প্রথম তিন দিন প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্য দেননি। শুধু হোয়াইট হাউস থেকে প্রকাশিত কিছু ছবিতে তাকে দেখা যায়, যা তার বিচ্ছিন্নতার গুঞ্জন আরও বাড়িয়ে দেয়।

একটি ছবিতে দেখা যায় ট্রাম্প ফ্লোরিডার মার-এ-লাগোতে অস্থায়ী পরিস্থিতি কক্ষ থেকে ইরানে হামলা পর্যবেক্ষণ করছেন, পাশে রয়েছেন রুবিও ও সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ। আরেক ছবিতে ভ্যান্সকে হোয়াইট হাউসে বসে যুদ্ধ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে দেখা যায়, যেখানে তার সঙ্গে ছিলেন গ্যাবার্ড, অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এবং জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট।

অবশেষে যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রায় দুই দিন পর ভ্যান্স প্রকাশ্যে এসে বলেন, প্রেসিডেন্ট স্পষ্টভাবে তার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্র কোনো দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের দিকে যাবে না।

ভোট দিলেন রিপাবলিকান পার্টির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স

রুবিওর প্রভাব বাড়ছে

ইরান যুদ্ধের প্রসঙ্গে ভ্যান্সের অবস্থান পরিবর্তন তার রাজনৈতিক অবস্থানের সাম্প্রতিক কয়েকটি পরাজয়ের ধারাবাহিকতা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

তিনি ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন বন্ধ করার দাবি তুলেছিলেন এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে হোয়াইট হাউসে সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু পরে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক সহায়তা দেওয়া অব্যাহত রেখেছে।

একসময় তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পুরো পৃথিবীর পুলিশ হয়ে ওঠা উচিত নয়। কিন্তু ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার নির্দেশ দিলে সেখানেও ভ্যান্স নীরব ছিলেন।

এই সব ঘটনায় ট্রাম্প বরাবরই রুবিওর অবস্থানকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। অথচ নির্বাচনের রাতে ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি নতুন কোনো যুদ্ধ শুরু করবেন না বরং বিদ্যমান যুদ্ধ বন্ধ করার চেষ্টা করবেন।

এদিকে প্রশাসনের ভেতরে রুবিওর প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। ২০২৫ সালে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে ট্রাম্প ভ্যান্সকে পাঠালেও ২০২৬ সালে সেখানে আরও সূক্ষ্ম বার্তা নিয়ে রুবিওকে পাঠানো হয়।

ইরানে প্রথম মার্কিন হামলার চার দিন আগে কংগ্রেসে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প প্রকাশ্যে রুবিওর প্রশংসা করেন এবং তাকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেও উল্লেখ করেন।

ইরান সম্পর্কে কংগ্রেসকে ব্রিফ করবেন মার্কো রুবিও - বাংলাদেশ টাইমস

স্থলযুদ্ধের প্রশ্নে মতভেদ

যুদ্ধ কীভাবে এগোবে তা নিয়েও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পিট হেগসেথ ও রুবিওর মধ্যে ইরানে স্থলবাহিনী পাঠানো নিয়ে তীব্র বিতর্ক হয়েছে। সেখানে হেগসেথ স্থল আক্রমণের পক্ষে থাকলেও রুবিও ঝুঁকি বিবেচনায় তুলনামূলক সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।

পেন্টাগন অবশ্য এ ধরনের খবরকে সম্পূর্ণ ভুয়া বলে দাবি করেছে। পররাষ্ট্র দপ্তর এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

তবে এমন খবর ফাঁস হওয়াই ইঙ্গিত দেয় যে ওয়াশিংটনে বার্তা ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের শৃঙ্খলাহীনতা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের সময় সাধারণত একক অবস্থান বজায় রাখা জরুরি হলেও ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্য ও সময়সূচি তুলে ধরছেন।

এক সাবেক মার্কিন কূটনীতিক মন্তব্য করেছেন, পুরো অভিযানটি অনেকটা তাৎক্ষণিকভাবে নেওয়া সিদ্ধান্তের মতো মনে হচ্ছে, যেন এক সকালে উঠে হঠাৎ যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

Tensions soar as Hegseth and Rubio feud over US troops in Iran | Middle  East Eye

রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন

এই যুদ্ধ এখন ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিটি সদস্যের রাজনৈতিক ভাগ্যের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়, দ্রুত বিজয় না আসে বা ইরানের সরকার ক্ষমতায় থেকেই যায়, তবে তা ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি ও তার পুরো প্রশাসনের জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে।

বিশেষ করে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের জন্য এটি বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। যদিও ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান মনোনয়নের অন্যতম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তাকে দেখা হচ্ছে, তবুও সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত অপেক্ষা করছে।

তিনি যদি নিজের দীর্ঘদিনের যুদ্ধবিরোধী অবস্থানে অটল থাকেন, তবে ট্রাম্পের সমর্থন হারানোর ঝুঁকি থাকবে। আবার ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করলে তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ সমর্থকদের একটি অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।

ইতিমধ্যে ভ্যান্সের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত কিছু বিশ্লেষকও ইরান যুদ্ধ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ এটিকে অত্যন্ত নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ পদক্ষেপ বলেও মন্তব্য করেছেন। কিছু জরিপেও দেখা গেছে, ট্রাম্প সমর্থকদের মধ্যেও এ যুদ্ধ নিয়ে দ্বিধা রয়েছে। এক জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৪৫ শতাংশ রিপাবলিকান ভোটার হয় হামলার বিরোধিতা করেছেন, নয়তো এ বিষয়ে মত দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।