রাশিয়া এখনো ভারতের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেলের সরবরাহকারী। যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বা অনুমতির প্রয়োজন নেই বলেই জানিয়েছে ভারত সরকার। দেশটির দাবি, নিজেদের জাতীয় স্বার্থ ও বাজারমূল্যের ভিত্তিতেই তারা তেল কেনার সিদ্ধান্ত নেয়।
রুশ তেল নিয়ে ভারতের অবস্থান
ভারত সরকার জানিয়েছে, রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো দেশের অনুমতির প্রয়োজন নেই। সরকারিভাবে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনা করেই ভারত তেল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়।
সরকারের তথ্য ব্যুরো জানায়, ভারত কখনোই রুশ তেল কিনতে কোনো দেশের অনুমতির ওপর নির্ভর করেনি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বা নিষেধাজ্ঞার হুমকিও ভারতের এই নীতিকে বদলাতে পারেনি।
সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়, স্বল্পমেয়াদি কোনো ছাড় বা অনুমতির ওপর নির্ভর করে ভারত রুশ তেল কিনছে না। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্তও ভারত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করেছে এবং রাশিয়াই এখনো ভারতের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহকারী।

ইরান যুদ্ধ ও তেলের বাজারে অস্থিরতা
এই বক্তব্য এসেছে এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ঘোষণা দেন যে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল রাখতে ভারতকে ৩০ দিনের জন্য রুশ তেল কেনার অনুমতি দেওয়া হবে।
ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহের মধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে কারণ গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি এখন বন্ধ রয়েছে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বে ব্যবহৃত প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়।

ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশল
ভারত জানিয়েছে, দেশের জ্বালানি সরবরাহ বর্তমানে স্থিতিশীল এবং নিরাপদ। গত কয়েক বছরে দেশটি তেলের উৎস বহুমুখী করেছে। আগে যেখানে ২৭টি দেশ থেকে তেল আমদানি করা হতো, এখন সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০টি দেশে।
সরকার বলছে, জাতীয় স্বার্থে ভারত সেসব দেশ থেকেই তেল কেনে, যেখানে দাম সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক এবং সাশ্রয়ী।
রাশিয়া থেকে আমদানি কেন বাড়ল
২০২২ সালে ইউক্রেন সংঘাত তীব্র হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এরপর থেকেই ভারত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়।
২০২৫ সালের জুলাই মাসে ভারতের পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী হারদীপ সিং পুরি জানিয়েছিলেন, ভারতের মোট তেল আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশই তখন রাশিয়া থেকে আসছিল।
ভারতীয় কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ভারতের নীতি নির্ধারণ করে না। বরং জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে তিনটি বিষয়ই বেশি গুরুত্ব পায়—সাশ্রয়ী দাম, সহজলভ্যতা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব।
একজন কর্মকর্তা মন্তব্য করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত ‘ছাড়’ আসলে বাস্তবে খুব বেশি অর্থবহ নয়।

ওয়াশিংটনের চাপ ও ভারতের কৌশলগত স্বাধীনতা
দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে রাশিয়ার তেল আমদানি বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে আসছে। সম্প্রতি ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর বলেন, বাণিজ্য আলোচনার মাধ্যমে ওয়াশিংটন ভারতকে ভেনেজুয়েলা থেকে তেল কিনতে উৎসাহিত করছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ভারত নাকি রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে। তবে ভারত কখনোই এমন প্রতিশ্রুতির কথা স্বীকার করেনি।
নয়াদিল্লি বরাবরই তাদের নীতিকে ‘কৌশলগত স্বাধীনতা’ বলে উল্লেখ করে আসছে। ভারতের মতে, আন্তর্জাতিক রাজনীতির চাপের বদলে জাতীয় স্বার্থই তাদের জ্বালানি নীতির মূল ভিত্তি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















