আমেরিকায় বিদ্যুতের বিল বাড়ছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। অনেকেই মনে করছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালাতে ব্যবহৃত ডেটা সেন্টারগুলোর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ চাহিদাই এর মূল কারণ। তবে বাস্তবতা বলছে, বিদ্যুতের দাম বাড়ার পেছনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একমাত্র বা প্রধান কারণ নয়। বরং পুরোনো বিদ্যুৎ অবকাঠামো, যন্ত্রপাতির দাম বৃদ্ধি এবং জ্বালানি বাজারের পরিবর্তনই বড় ভূমিকা রাখছে।
ডেটা সেন্টারের বাড়তি বিদ্যুৎ চাহিদা
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের অ্যাশবার্ন শহরকে অনেকেই ডেটা সেন্টারের রাজধানী বলে থাকেন। প্রায় ৪৫ হাজার মানুষের এই শহরে রয়েছে দেড় শতাধিক ডেটা সেন্টার। এসব কেন্দ্র মিলিয়ে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার হয় তা প্রায় ১৬ লাখ মানুষের শহর ফিলাডেলফিয়ার সমান।
এই বাস্তবতার কারণে অনেকেই মনে করছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির প্রসারই বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। এমনকি ৪ মার্চ প্রযুক্তি কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি অঙ্গীকারনামা স্বাক্ষর করান। সেখানে বলা হয়, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো নিজেদের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলবে যাতে সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ বিল না বাড়ে।
আসল কারণ অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতির খরচ
তবে গবেষণা বলছে অন্য কথা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদ্যুতের খুচরা দাম সাধারণ মূল্যস্ফীতির তুলনায় দ্রুত বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু এর প্রধান কারণ ডেটা সেন্টার নয়।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিদ্যুৎ গ্রিড উন্নয়ন, উৎপাদন যন্ত্রপাতি এবং তামার মতো কাঁচামালের দাম বাড়ার কারণেই বিদ্যুতের খরচ বেড়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যবহৃত ট্রান্সফরমারের ঘাটতিও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত বছর বিতরণ ট্রান্সফরমারের চাহিদা সরবরাহের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি ছিল। বড় ট্রান্সফরমারের ক্ষেত্রে এই ঘাটতি ছিল প্রায় ৩০ শতাংশ।
এখন অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ সরঞ্জাম পেতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে দুই বছরের বেশি সময়, যেখানে ২০২১ সালে অপেক্ষার সময় ছিল প্রায় এক বছর।
পুরোনো অবকাঠামো ও জলবায়ুর চাপ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যুৎ অবকাঠামোর অনেক অংশই বহু পুরোনো। ঝড়, তাপপ্রবাহ ও দাবানলের মতো চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়ায় এসব অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করতে হচ্ছে।
শুধু ক্যালিফোর্নিয়াতেই ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বড় বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো দাবানলের ঝুঁকি কমাতে প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। আগামী কয়েক বছরেও বিদ্যুৎ খাতে বিপুল বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে, যার বড় অংশই যাবে পুরোনো যন্ত্রপাতি বদলানো ও অবকাঠামো শক্তিশালী করার কাজে।
জ্বালানি বাজারের পরিবর্তনও প্রভাব ফেলছে
বিদ্যুতের দাম বাড়ার পেছনে জ্বালানি বাজারের পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি বাড়ার ফলে দেশীয় ক্রেতাদের আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে।
একই সঙ্গে সৌর ও বায়ু শক্তির সম্প্রসারণে বাধা তৈরি হওয়ায় সস্তা বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগও কিছু ক্ষেত্রে কমে যাচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
)
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উল্টো দাম কমাতেও পারে
মজার বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিদ্যুতের দাম কমাতেও সহায়তা করতে পারে। বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো ইতিমধ্যে নিজেদের বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে, যার বড় অংশই পরিচ্ছন্ন জ্বালানিভিত্তিক।
একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় চালু করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করেছে মাইক্রোসফট। অন্যদিকে মেটা কয়েকটি পারমাণবিক প্রযুক্তি উদ্যোগে অর্থায়ন করেছে। একটি বড় সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি প্রকল্পেও বড় বিনিয়োগ করা হয়েছে।
শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, বিদ্যুৎ ব্যবহারের পদ্ধতিও বদলাচ্ছে। কিছু ডেটা সেন্টার প্রয়োজনে নিজেদের বিদ্যুৎ ব্যবহার কমিয়ে দেয়, আবার কখনও অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে ফেরত দেয়। এর ফলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা আরও নমনীয় হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বড় এবং নমনীয় গ্রাহক যুক্ত হয়, তবে বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর আয় বাড়ে এবং একই সঙ্গে সাধারণ গ্রাহকদের বিল কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।
চাহিদা বাড়লে বিল কমার উদাহরণও আছে
কিছু অঞ্চলে দেখা গেছে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার পরও বিদ্যুতের দাম কমেছে। উদাহরণ হিসেবে উত্তর ডাকোটায় তেল ও গ্যাস শিল্প, ক্রিপ্টো খনি, ডেটা সেন্টার এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পের কারণে বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়েছে। কিন্তু এর ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের বিদ্যুৎ বিল কমেছে।
বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুতের ব্যবহারে প্রতি এক গিগাওয়াট বৃদ্ধি হলে অনেক ক্ষেত্রে বিল প্রায় দুই শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বিদ্যুতের দাম বাড়ার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে দোষ দেওয়া সহজ হলেও বাস্তব চিত্র অনেক বেশি জটিল। বরং প্রযুক্তি খাতের বিনিয়োগ ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ ও সাশ্রয়ী করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















