ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায়। বিশেষ করে চীনের লজিস্টিকস কোম্পানিগুলো পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, রুট বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং পণ্য আটকে পড়ার মতো সমস্যায় পড়েছে। শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সংকটের প্রভাব কয়েক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

সংকটে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা
ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজার এবং পরিবহন রুটে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। অপরিশোধিত তেলের দাম অস্থির হয়ে উঠেছে, আর বিভিন্ন বাণিজ্যিক রুটে পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ই-কমার্স পণ্য আটকে পড়েছে এবং মালবাহী পরিবহনের ভাড়া দ্রুত বাড়ছে। শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হতে পারে, তবুও বাস্তব পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত।
বিকল্প রুটের সন্ধানে চীনা কোম্পানি
এই সংকটের মধ্যে কিছু চীনা প্রতিষ্ঠান মধ্য এশিয়ার বিকল্প বাণিজ্যপথের দিকে নজর দিচ্ছে। তবে যেসব ব্যবসা মধ্যপ্রাচ্যকে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ হিসেবে ব্যবহার করে, তারা এখনো বড় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
গুয়াংঝৌতে অনুষ্ঠিত গ্রেটার বে এরিয়া এয়ারলাইন লজিস্টিকস ফোরামে এক প্রদর্শক জানান, তার কোম্পানি সম্প্রতি তাদের ট্রান্সশিপমেন্ট কেন্দ্র কাতারের দোহায় সরিয়ে নিয়েছে। সেখান থেকে পণ্য স্পেনের মাদ্রিদে পাঠানো হয়।
এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ছিল লোহিত সাগরের উত্তেজনা এড়িয়ে যাওয়া। কারণ ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা ওই এলাকায় বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে, যা তাদের দাবি অনুযায়ী গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ বন্ধ করার চাপ তৈরির অংশ।
তবে এই নতুন রুট কোম্পানির জন্য নতুন সমস্যাও তৈরি করেছে। তিনি বলেন, আমরা বেশি খরচে এই রুট বেছে নিয়েছিলাম যাতে লোহিত সাগরের উত্তেজনা এড়ানো যায়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
তার মতে, বর্তমানে প্রায় এক লাখ টন পণ্য বিমানবন্দরে আটকে আছে, যার বেশিরভাগই ই-কমার্স প্যাকেজ। এতে চীনের বিক্রেতা ও ইউরোপের ক্রেতারা গভীর উদ্বেগে রয়েছেন।

ক্ষতি আপাতত সীমিত
তিনি আরও জানান, সংঘাতটি এমন সময়ে শুরু হয়েছে যখন ব্যবসার মৌসুম তুলনামূলকভাবে ধীর। চীনা নববর্ষ সদ্য শেষ হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে এখন রমজান চলছে। ফলে এখন পর্যন্ত ক্ষতি এমন পর্যায়ে রয়েছে যা বীমা কোম্পানিগুলো সামাল দিতে পারবে।
দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার আশঙ্কা
ফোরামে উপস্থিত গুয়াংঝৌ জিয়ালিয়ানশুন লজিস্টিকসের এক ব্যবস্থাপক সতর্ক করে বলেন, এই বিঘ্ন ছয় মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
কোম্পানিটির রুট ব্যবস্থাপক ইউ মিংসিন বলেন, এ বছর মালবাহী পরিবহনের ভাড়া রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।
তিনি জানান, বৈশ্বিক বিমানবহর দ্রুত পুরোনো হয়ে যাচ্ছে। প্রতি বছর প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি বিমান অবসর নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু নতুন সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ৫০ থেকে ৬০টি। ফলে পরিবহন সক্ষমতা আগেই কমে যাচ্ছিল। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে দেবে।
গুয়াংডংয়ের উৎপাদকদের ওপর চাপ
এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে চীনের গুয়াংডং প্রদেশের উৎপাদকদের ওপরও। এই অঞ্চলটি ছোট আকারের রপ্তানি পণ্যের একটি বড় কেন্দ্র।
গুয়াংঝৌ কোয়ান্টিটেটিভ কনসাল্টিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা ইয়াং শুয়েহাই বলেন, মধ্যপ্রাচ্য হয়ে পণ্য পরিবহনের ব্যবস্থা বড় ধাক্কা খেয়েছে।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, মধ্যপ্রাচ্যের অনেক এয়ারলাইন বড় আকারের বিমান ব্যবহার করে, যেমন এয়ারবাস এ–৩৮০ এবং বোয়িং ৭৪৭। ফলে চীনের অনেক বিক্রেতা বিদেশে পণ্য পাঠাতে এই অঞ্চলকে ট্রানজিট কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করেন।
সংঘাতের আগে মধ্যপ্রাচ্যে মালবাহী ভাড়া ছিল প্রতি কেজি প্রায় তিন ডলার। কিন্তু পরিবহন সক্ষমতা কমে যাওয়ায় এক পর্যায়ে এই দাম দুই থেকে তিন গুণ বেড়ে যায়, যদিও পরে কিছুটা কমেছে।
হরমুজ প্রণালির সংকটের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে এশিয়া থেকে ইউরোপে পণ্য বহনকারী বড় রুটগুলোর পরিবহন সক্ষমতা ২৬ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ফ্লাইট আবার চালু হয়েছে।
![]()
জ্বালানি দামের প্রভাব
ইয়াং শুয়েহাই বলেন, বিমান, জাহাজ ও সড়ক পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ব্যবহৃত হয়। ফলে তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচও বাড়ে।
এছাড়া কৃত্রিম তন্তু, রাসায়নিক, প্লাস্টিক ও রাবারের মতো কাঁচামালের দামও বাড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
লজিস্টিকস খরচ দ্রুত বাড়ছে
হংকং লজিস্টিকস শিল্প চেম্বারের চেয়ারম্যান কেন চুং বলেন, বৈশ্বিক তেলের দাম বাড়ায় মূল ভূখণ্ড চীন থেকে হংকংয়ে সড়কপথে পরিবহন খরচ ইতোমধ্যে ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
তিনি আরও জানান, হংকং থেকে বিদেশগামী সমুদ্রপথে পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি দিয়ে গেলে প্রতি চালানে অতিরিক্ত ১ হাজার ৫০০ ডলার পর্যন্ত খরচ যোগ হচ্ছে।
তার মতে, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে লজিস্টিকস ব্যয় ৩০ শতাংশেরও বেশি বাড়তে পারে। তখন আফ্রিকার গুড হোপ অন্তরীপ ঘুরে পণ্য পাঠানোর বিকল্প পথও ব্যবহার করতে হতে পারে।
মধ্য এশিয়ার পথে নতুন আগ্রহ
এই অস্থিরতার কারণে বিকল্প বাণিজ্যপথের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। ইউরোপে পণ্য পাঠানোর নতুন উপায় খুঁজতে গিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান মধ্য এশিয়ার রুটের দিকে ঝুঁকছে।
মধ্য এশিয়া ও রাশিয়া বিষয়ক এক কাস্টমস ব্রোকারেজ ব্যবস্থাপক জানান, গত এক সপ্তাহে এই রুট সম্পর্কে অনুসন্ধান প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে।
চীনের পশ্চিম সীমান্ত থেকে তুর্কমেনিস্তান হয়ে অথবা ককেশাস অঞ্চলের আজারবাইজান হয়ে তুরস্কের মাধ্যমে ইউরোপে যাওয়ার পথ দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
যুদ্ধের কারণে ব্যবসায়িক বিপর্যয়
তিনি জানান, রোববার শেনঝেনের এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে তার দেখা হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতে একটি অ্যামাজন ডেটা সেন্টার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ওই ব্যবসায়ীর ব্যাকএন্ড সিস্টেম ভেঙে পড়ে এবং বিপুল সংখ্যক অর্ডার হারিয়ে যায়।
এরপর তিনি দ্রুত লজিস্টিকস ও প্ল্যাটফর্ম পুনর্গঠনের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই যুদ্ধ অনেক বিক্রেতাকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে শুধু একটি দ্রুত রুটের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন বিকল্প পথ তৈরি রাখা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















