বিশ্বের কোন দেশের মানুষ নিজেদের সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি উচ্চ ধারণা পোষণ করে—এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য। নতুন এক আন্তর্জাতিক জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে আত্মমুগ্ধতার মাত্রা একেবারেই ভিন্ন এবং কিছু দেশের মানুষ এই বৈশিষ্ট্যে অন্যদের তুলনায় এগিয়ে। গবেষণার ফলাফল বলছে, জার্মানিতে আত্মমুগ্ধতার মাত্রা সবচেয়ে বেশি।
৫৩ দেশের মানুষের ওপর বিশাল জরিপ
গবেষণায় বিশ্বের ৫৩টি দেশের প্রায় ৪৫ হাজার মানুষের মতামত বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের ব্যক্তিত্ব, আত্মদৃষ্টিভঙ্গি এবং আচরণগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিস্তারিত প্রশ্ন করা হয়েছিল। সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা বিভিন্ন দেশে আত্মমুগ্ধতার মাত্রা নির্ধারণ করেন।
ফলাফলে দেখা যায়, আত্মমুগ্ধতার দিক থেকে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে জার্মানি। এই তালিকায় জার্মানির পরেই রয়েছে ইরাক, চীন, নেপাল ও দক্ষিণ কোরিয়া। অন্যদিকে আত্মমুগ্ধতার মাত্রা সবচেয়ে কম পাওয়া গেছে সার্বিয়া, আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস ও ডেনমার্কে।
মোট ৫৩ দেশের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হয়েছে ১৬তম স্থানে। সাধারণ ধারণায় যুক্তরাষ্ট্রকে প্রায়ই আত্মমুগ্ধতার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও গবেষণার ফল বলছে বাস্তব চিত্র কিছুটা ভিন্ন।
আত্মমুগ্ধতা সব সমাজেই আছে
গবেষকদের মতে, আত্মমুগ্ধতা কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা সংস্কৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রায় প্রতিটি দেশেই এই বৈশিষ্ট্যের মানুষের উপস্থিতি রয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিটি সমাজেই এমন মানুষ আছে যারা নিজের সাফল্য বা পরিচয় নিয়ে গর্ব করতে পছন্দ করে, আবার অনেকেই আছে যারা তুলনামূলকভাবে বিনয়ী।
এই বৈচিত্র্যই দেখায় যে আত্মমুগ্ধতা একটি জটিল মানসিক বৈশিষ্ট্য, যা বিভিন্ন সামাজিক ও ব্যক্তিগত পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে প্রকাশ পায়।

তরুণদের মধ্যে বেশি দেখা যায়
গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, তরুণদের মধ্যে আত্মমুগ্ধতার মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি। বিশেষ করে যৌবনের শুরুতে মানুষ নিজের পরিচয় গড়ে তোলা, স্বাধীনতা অর্জন এবং সামাজিক মর্যাদা পাওয়ার চেষ্টা করে।
এই সময়ে আত্মবিশ্বাস, নিজের ওপর মনোযোগ এবং ব্যক্তিগত সাফল্যের প্রতি জোর দেওয়ার প্রবণতা অনেক ক্ষেত্রে সহায়কও হতে পারে। তাই তরুণদের মধ্যে এই বৈশিষ্ট্য কিছুটা বেশি দেখা যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।
পুরুষদের মধ্যে প্রবণতা বেশি
গবেষণায় আরেকটি বিষয়ও সামনে এসেছে। নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে আত্মমুগ্ধতার বৈশিষ্ট্য কিছুটা বেশি দেখা যায়।
গবেষকেরা মনে করেন, সমাজে পুরুষদের আধিপত্য বা ক্ষমতার ধারণা দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত থাকায় এই পার্থক্য তৈরি হতে পারে।
আত্মমুগ্ধতার দুই দিক
গবেষণায় আত্মমুগ্ধতাকে দুই ভাগে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রথমটি আত্মপ্রশংসামূলক প্রবণতা, যেখানে ব্যক্তি নিজের সাফল্য ও গুণাবলি নিয়ে গর্ব করে এবং নিজের গুরুত্ব বাড়িয়ে দেখতে চায়।
এই বৈশিষ্ট্য সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে নাইজেরিয়া, ইরাক, চীন, নেপাল ও তুরস্কে। অন্যদিকে নরওয়ে, ডেনমার্ক, আয়ারল্যান্ড, রাশিয়া ও যুক্তরাজ্যে এই প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কম।
দ্বিতীয় দিকটি হলো প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক আত্মমুগ্ধতা, যেখানে অন্যদের সঙ্গে তুলনা করে নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়। এই ক্ষেত্রে জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া, নেপাল, ইরাক ও রোমানিয়ার মানুষের স্কোর বেশি।
সমষ্টিকেন্দ্রিক সমাজ নিয়ে নতুন প্রশ্ন
গবেষকেরা ধারণা করেছিলেন যে যেসব সমাজে সমষ্টিগত মূল্যবোধ বেশি গুরুত্ব পায় সেখানে আত্মমুগ্ধতা কম হবে। কিন্তু ফলাফল বলছে ভিন্ন কথা।
সমষ্টিকেন্দ্রিক সংস্কৃতির দেশগুলোতেও আত্মমুগ্ধতার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে সামাজিক মর্যাদা ও শ্রেণিবিন্যাসের প্রতি সংবেদনশীলতা অনেক সময় এই বৈশিষ্ট্যকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
আত্মমুগ্ধতা সর্বত্রই বিদ্যমান
গবেষকেরা মনে করেন, এই ফলাফল মানুষের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে আরও সূক্ষ্ম ও বাস্তবসম্মত ধারণা দিতে পারে। আত্মমুগ্ধতা কোনো নির্দিষ্ট দেশ, প্রজন্ম বা মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন সমাজে এটি ভিন্নভাবে প্রকাশ পেলেও এর উপস্থিতি প্রায় সর্বত্রই দেখা যায়।
মানুষের ব্যক্তিত্ব, সামাজিক পরিবেশ এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ—সব মিলিয়েই এই বৈশিষ্ট্য গড়ে ওঠে।
Sarakhon Report 


















