কুকুরকে দীর্ঘদিন ধরেই মানুষের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী বলা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে, এই সঙ্গী হয়তো মানুষের জীবনও দীর্ঘ করতে সাহায্য করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কুকুরের সঙ্গে বসবাস শুধু আনন্দ বা বন্ধুত্বই দেয় না, বরং মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের পোষা প্রাণী আছে, বিশেষ করে কুকুর, তারা সাধারণত অন্যদের তুলনায় বেশি সুস্থ থাকেন। যদিও বিজ্ঞানীরা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নন, ঠিক কোন কারণে এই ইতিবাচক প্রভাব তৈরি হয়।
মহামারির একাকিত্বে কুকুরের সঙ্গ
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ধ্রুব কাজী ছোটবেলা থেকেই কুকুরের প্রতি ভীষণ অনুরাগী ছিলেন। তবে নিজের জীবনে প্রথম কুকুরটি তিনি নেন চল্লিশের কোঠায় এসে। তিনি তখন যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে একটি হাসপাতালের হৃদযন্ত্রের নিবিড় পরিচর্যা বিভাগের পরিচালক হিসেবে কাজ করছিলেন।
এর কিছুদিন পরই শুরু হয় বৈশ্বিক মহামারি। একা বসবাস করা এবং প্রতিদিন নিবিড় পরিচর্যা বিভাগে কাজ করার চাপ তাকে গভীর একাকিত্বে ফেলেছিল। সেই সময় তার জীবনে আসে রুমি নামের একটি ছোট কুকুর।

রুমির সঙ্গে জীবন বদলে যেতে শুরু করে। তিনি বেশি সময় বাইরে কাটাতে শুরু করেন, প্রতিবেশীদের সঙ্গে পরিচয় বাড়ে এবং দৈনন্দিন জীবনে ফিরে আসে আনন্দের মুহূর্ত। ধ্রুব কাজীর ভাষায়, সেই কঠিন সময়ে মানসিক ভারসাম্য ধরে রাখতে কুকুরটির ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্যের সঙ্গে কুকুরের সম্পর্ক
দশকের পর দশক ধরে করা বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কুকুরের মালিকদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি তুলনামূলক কম। একই সঙ্গে হৃদরোগের সম্ভাবনাও কম দেখা যায়। এমনকি হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের পর মৃত্যুহারও তুলনামূলক কম হতে পারে।
একটি বড় পর্যালোচনা গবেষণায় দেখা গেছে, যারা কুকুর পালন করেন তাদের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময়ে সব ধরনের কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় এক চতুর্থাংশ পর্যন্ত কম থাকতে পারে।
এই কারণেই হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের সংগঠনগুলোও বলছে, কুকুরের মালিকানা হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে শুধুমাত্র স্বাস্থ্য ভালো রাখার উদ্দেশ্যে কুকুর নেওয়ার পরামর্শ তারা সরাসরি দেন না।
কেন কুকুর মালিকরা বেশি সুস্থ
গবেষকদের ধারণা, এর অন্যতম কারণ শারীরিক সক্রিয়তা। কুকুর পালন করলে নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করতে হয়। ফলে অনেকেই স্বাভাবিকভাবেই বেশি শারীরিক ব্যায়াম করেন।

একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যারা নিয়মিত কুকুরকে হাঁটাতে নিয়ে যান তারা সাধারণত সাপ্তাহিক ব্যায়ামের নির্ধারিত মান পূরণ করতে সক্ষম হন। তবে সব কুকুরের মালিক যে নিয়মিত হাঁটতে যান, এমনও নয়।
অন্য গবেষণায় দেখা গেছে, কুকুর থাকা মানেই সুস্থ জীবনধারা নিশ্চিত নয়। মানুষের জীবনযাপন যেমন, অনেক সময় কুকুরের জীবনযাপনও তেমন হয়ে ওঠে। এমনকি কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, মালিকের যদি কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে, সেই পরিবেশের প্রভাব কুকুরের ওপরও পড়তে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, কুকুর মানুষের মানসিক সুস্থতার ওপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। যারা একা থাকেন বা পরিবার থেকে দূরে থাকেন, তাদের জন্য পোষা প্রাণী গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গী হয়ে উঠতে পারে।
একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার যে নেতিবাচক প্রভাব মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর পড়ে, কুকুর অনেক সময় তা কমিয়ে দিতে পারে। নিয়মিত সঙ্গ, খেলাধুলা এবং যত্ন নেওয়ার মাধ্যমে মানুষের জীবনে ইতিবাচক আবেগ তৈরি হয়।
![]()
তবে এর বিপরীত দিকও আছে। কুকুরের যত্ন নেওয়া সহজ নয়। প্রশিক্ষণ দেওয়া, চিকিৎসা ব্যয় বহন করা এবং সময় দেওয়া—সব মিলিয়ে এটি একটি বড় দায়িত্ব। তবুও অনেকের কাছে এই সম্পর্কের আনন্দই সবচেয়ে বড় পুরস্কার।
ধ্রুব কাজীর কথায়, কুকুরের যত্ন নেওয়া অনেক পরিশ্রমের কাজ, কিন্তু তারা জীবনে যে আনন্দ নিয়ে আসে, সেটাই সবকিছুকে অর্থবহ করে তোলে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















