এক ভাষণের আগুন, এক শহরের জাগরণ ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ—ঢাকার আকাশে যেন অদৃশ্য এক আগুন জ্বলে উঠেছিল। রেসকোর্স ময়দানে দাঁড়িয়ে শেখ মুজিবুর রহমান যখন ঘোষণা করেছিলেন—“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,”—তখন সেই আহ্বান শুধু জনতার হৃদয়ে নয়, ছড়িয়ে পড়েছিল শহরের প্রতিটি অলিগলি, দেয়াল আর নীরব স্থাপনাতেও।
ঢাকার এক কোণে, আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ এক এলাকা—পলাশী—সেই আহ্বানকে ধারণ করে হয়ে উঠেছিল প্রতিরোধের এক গোপন ঘাঁটি। পলাশীর উত্থান: ব্যারাক থেকে আন্দোলনের ঘাঁটি পলাশীর ইতিহাস কেবল একটি ভৌগোলিক জায়গার বিবর্তন নয়; এটি একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরের গল্প। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, ১৯৪৩ সালে, সামরিক প্রয়োজন মেটাতে এখানে গড়ে ওঠে “পলাশী ব্যারাক”—একটি অস্থায়ী সেনাছাউনি। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে এই ব্যারাকগুলো সরকারি কর্মচারীদের আবাসে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অস্থায়ী বসতি হয়ে ওঠে স্থায়ী জীবনের অংশ। পলাশীর চারপাশে গড়ে ওঠে এক বৈচিত্র্যময় সমাজ— একদিকে মধ্যবিত্তের আবাস, অন্যদিকে শ্রমজীবী মানুষের বস্তি; মাঝখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-এর বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ। এই অনন্য সংমিশ্রণ পলাশীকে করে তোলে রাজনৈতিকভাবে সজাগ, আন্দোলনপ্রবণ এবং প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত এক এলাকা।
ভাষা আন্দোলন: প্রতিরোধের প্রথম স্ফুলিঙ্গ পলাশীর রাস্তায় প্রথম প্রতিবাদের গর্জন শোনা যায় ভাষা আন্দোলনের সময়। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে যখন আন্দোলন তুঙ্গে, তখন মুসলিম লীগের সমর্থিত একটি সশস্ত্র দল লালবাগ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু পলাশীতে ছাত্র-জনতার তীব্র প্রতিরোধে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। এই ঘটনার পর থেকেই পলাশী হয়ে ওঠে এক প্রতিরোধ-অঞ্চল—যেখানে প্রতিটি আন্দোলনের সময় মানুষ সংগঠিত হতো, প্রস্তুতি নিত।
২৫ মার্চ: ব্যারিকেডের শহরে রূপান্তর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত—একটি আশঙ্কায় ঘেরা সময়। গুজব নয়, প্রায় নিশ্চিত সংবাদ—পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ করবে। রাত নামতেই পলাশী বদলে যায় এক অদ্ভুত দৃশ্যে। মানুষ ঘর ছেড়ে রাস্তায় নামে— কারও হাতে কুড়াল, কারও হাতে বাঁশ, কারও হাতে শুধুই সাহস। গাছ কেটে, ড্রেনের পাইপ ফেলে, ভাঙা গাড়ি এনে রাস্তার ওপর সাজিয়ে তোলা হয় ব্যারিকেড। পলাশী হয়ে ওঠে এক জীবন্ত প্রতিরোধ-দুর্গ। এটি ছিল এক স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ— নেই আধুনিক অস্ত্র, নেই সামরিক প্রশিক্ষণ; আছে শুধু বিশ্বাস— “যার কাছে যা আছে, তাই নিয়েই প্রতিরোধ।”

অপারেশন সার্চলাইট:
রক্তে ভেজা রাত রাত গভীর হতেই শুরু হয় অপারেশন সার্চলাইট—ঢাকার ওপর নেমে আসে এক নির্মম হত্যাযজ্ঞ। পাকিস্তানি বাহিনী দুই দিক দিয়ে অগ্রসর হয়— একটি দল নীলক্ষেত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে, অন্যটি নিউ মার্কেট ও আজিমপুর হয়ে পলাশীর দিকে। পলাশীতেই তারা প্রথম বাধার মুখে পড়ে। নিরস্ত্র মানুষ ব্যারিকেডের আড়ালে দাঁড়িয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তারা জানত—তাদের অস্ত্র দুর্বল, কিন্তু মনোবল অটুট। অবশেষে ভারী অস্ত্রের মুখে সেই প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। রক্তে রঞ্জিত হয় পলাশীর মাটি। ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয় কর্মরত সদস্যদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকা পরিণত হয় এক মৃত্যুপুরীতে। স্মৃতির ভেতর এক সাক্ষ্য সেই রাতের কথা স্মরণ করেন মুক্তিযোদ্ধা আমির হোসেন। তিনি জানান, ৭ মার্চের ভাষণের পর থেকেই প্রস্তুতি শুরু হয়। হোসেনি দালানের পাশে রাতের অন্ধকারে কাঠের ডামি রাইফেল দিয়ে চলত প্রশিক্ষণ। ২৫ মার্চ রাতে খবর আসে—আক্রমণ আসন্ন। বকশীবাজার ও চানখাঁরপুলে দ্রুত ব্যারিকেড গড়ে তোলা হয়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে চারদিক। ভোরে পলাশীতে গিয়ে তারা দেখেন লাশ, আহতদের আর্তনাদ, ধোঁয়া আর রক্তের গন্ধ। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা আহতদের নিয়ে যান ঢাকা মেডিকেলে— যেখানে চিকিৎসকের অভাব, কিন্তু মানবিকতার অভাব ছিল না।
পলাশী:
প্রতিরোধের প্রতীক পলাশী কোনো বৃহৎ যুদ্ধক্ষেত্র ছিল না, ছিল না কোনো আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ। তবুও এটি এক প্রতীক— নিরস্ত্র মানুষের সাহসের প্রতীক, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাওয়ার প্রতীক। এই প্রতিরোধ সামরিকভাবে সফল না হলেও, এটি প্রমাণ করেছিল— বাংলার মানুষ পরাজয় মেনে নেওয়ার জন্য জন্মায়নি। আজকের পলাশী: স্মৃতির নীরব সাক্ষী আজকের পলাশীতে দাঁড়ালে সেই ব্যারিকেডের কোনো চিহ্ন চোখে পড়ে না। নেই সেই ব্যারাক, নেই সেই বস্তি, নেই আগুনের সেই রাত। কিন্তু ইতিহাস কখনো হারিয়ে যায় না— তা বেঁচে থাকে মানুষের স্মৃতিতে, শহরের বাতাসে, মাটির গভীরে। পলাশী আজও যেন নীরবে বলে— “এক রাতে, এই শহর নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য দাঁড়িয়েছিল।”
মোঃ সিদ্দিকুর রহমান স্বপন 


















