১০:৫৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬
ট্রাম্প ঘনিষ্ঠতায় পাকিস্তানের উত্থান: কূটনীতি থেকে ব্যবসায় নতুন শক্তির বার্তা জ্বালানি তেল নিয়ে মজুতদারির অভিযোগ, কিন্তু দায় কার তেলের দামে উল্লম্ফন, কিন্তু ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত: যুদ্ধের লাভে শঙ্কিত পশ্চিমা জ্বালানি কোম্পানিগুলো লন্ডনে একা থাকা এখন বিলাসিতা: ভাড়া বাঁচাতে ৩৫ পেরিয়েও বাড়ছে রুমমেট সংস্কৃতি ইউরোপের প্রবৃদ্ধি সংকট: ঐক্যহীনতা ও সংস্কার জটিলতায় ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ কেন ইরানের পক্ষে লাভজনক পিঁপড়াদের থ্রিডি জগত উন্মোচন, বিজ্ঞানীদের চোখে অবাক করা জীববৈচিত্র্যের মিছিল হরমুজ বন্ধ, বিশ্ব বাণিজ্যের ঝুঁকির নতুন মানচিত্র হলিউড ছাড়ছে অস্কার, ২০২৯ থেকে নতুন ঠিকানা ডাউনটাউন লস অ্যাঞ্জেলেসে ব্রেক্সিটের পর ইংল্যান্ডের কৃষিনীতি: অন্য দেশের জন্য নতুন দৃষ্টান্ত

যুদ্ধের আতঙ্কে ভিডিও কলের গ্রাম: ওড়িশার মানিকাপুরে গালফে থাকা প্রিয়জনদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় পরিবার

ওড়িশার গঞ্জাম জেলার ছোট্ট গ্রাম মানিকাপুরে গত কয়েক দিনে এক অদ্ভুত দৃশ্য তৈরি হয়েছে। প্রায় প্রতিটি বাড়ির মোবাইলের পর্দা দিনরাত জ্বলছে। মা ছেলেকে বাড়ি ফিরতে বলছেন, স্ত্রী স্বামীকে সাবধানে থাকতে অনুরোধ করছেন, আর বোনেরা ভাইদের বলছেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে অর্থ উপার্জনের প্রয়োজন নেই। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের প্রভাব এখন সরাসরি এসে পৌঁছেছে এই দূরবর্তী গ্রামেও।

যুদ্ধের খবরেই বদলে গেছে গ্রামের জীবন

ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই মানিকাপুরের প্রায় প্রতিটি পরিবার উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছে। গ্রামের প্রায় সাতশো পঞ্চাশটি পরিবারের অধিকাংশেরই অন্তত একজন সদস্য গালফ অঞ্চলে কাজ করেন। ফলে যুদ্ধের খবর এলেই গ্রামজুড়ে উৎকণ্ঠা বাড়ে।

অনেক পরিবার এখন প্রায় প্রতিদিন ভিডিও কলে কথা বলছে। কেউ জানতে চাইছেন তাদের ছেলেরা নিরাপদে আছে কি না, কেউ আবার স্বামীদের দ্রুত দেশে ফেরার অনুরোধ করছেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই অপেক্ষা দীর্ঘই হচ্ছে।

Missiles and drones strike at the heart of a village in Odisha - The Hindu

বিদেশে কাজই গ্রামের অর্থনীতির ভরসা

মানিকাপুর পঞ্চায়েতের প্রধান উদয়নাথ বারিক নিজেও বহু বছর বিদেশে কাজ করেছেন। তার মতে, ভারতের তুলনায় গালফ অঞ্চলে মজুরি বেশি হওয়ায় গ্রামের তরুণেরা সেখানে কাজ করতে আগ্রহী হন। অনেকেই মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকের পরেই বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

বিদেশে থাকা শ্রমিকেরা মাসে প্রায় কুড়ি হাজার থেকে ষাট হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়িতে পাঠান। এই অর্থেই অনেক পরিবারের জীবনযাত্রা চলে এবং গ্রামের বহু বাড়ি পাকা দোতলা বাড়িতে পরিণত হয়েছে।

যুদ্ধের আতঙ্কে পরিবারগুলোর দিন কাটছে উদ্বেগে

গ্রামের বাসিন্দা নমিতা সিং জানান, তার দুই ছেলে জর্ডানে কাজ করেন। আগে তিনি সংবাদ খুব একটা দেখতেন না, কিন্তু এখন প্রতিদিন যুদ্ধের খবর দেখতে বাধ্য হচ্ছেন। ছেলেরা কখনো কখনো আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র আটকানোর দৃশ্য কিংবা বিস্ফোরণের ভিডিও পাঠায়। প্রতিবার কথোপকথনের শেষে তারা মাকে আশ্বস্ত করে বলে যে তারা নিরাপদে আছে।

Missiles and drones strike at the heart of a village in Odisha - The Hindu

অন্যদিকে ষাটোর্ধ্ব রিনা জেনা প্রতিদিন স্মার্টফোনে ছেলের সঙ্গে কথা বলেন। তার ছেলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে নিরাপত্তা কর্মী হিসেবে কাজ করেন। টেলিভিশনে যুদ্ধের খবর দেখলেই তিনি ছেলেকে ফোন করে সতর্ক থাকতে বলেন।

বিদেশে কঠিন জীবন, তবু ফিরতে পারছেন না অনেকে

বিদেশে কাজ করা অনেক তরুণের জীবন সহজ নয়। জর্ডানে কর্মরত তেইশ বছর বয়সী অজয় জানান, প্রায় বারো থেকে তেরো ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। একটি ছোট ঘরে আটজন পর্যন্ত শ্রমিক থাকেন। খাবারও সব সময় পছন্দসই হয় না। তবু পরিবারের জন্য কিছু টাকা সঞ্চয় করার আশায় তারা এই কষ্ট সহ্য করেন।

অনেক শ্রমিক তাদের পাসপোর্ট নিয়োগকর্তার কাছে জমা রাখেন। ফলে হঠাৎ দেশে ফিরতে চাইলে নানা জটিলতার মুখে পড়তে হয়। তাছাড়া বিমানের টিকিট কেনার মতো অর্থও অনেক সময় তাদের কাছে থাকে না।

সামাজিক চাপও বাড়ায় বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা

Missiles and drones strike at the heart of a village in Odisha - The Hindu

গ্রামে বিদেশে কাজ করার পেছনে সামাজিক কারণও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের জন্য পাকা বাড়ি তৈরি করা কিংবা মেয়েদের বিয়ের খরচ জোগাড় করার জন্য অনেকেই বিদেশে কাজ করতে যান। বিয়ের সময় নগদ অর্থ, গয়না ও বড় আয়োজনের ভোজের খরচ অনেক পরিবারের জন্য বড় চাপ তৈরি করে।

এই পরিস্থিতিতে বহু পরিবার ঋণ নেয় এবং পরে সেই ঋণ শোধ করার জন্য পরিবারের পুরুষ সদস্যদের বিদেশে পাঠায়।

পিছনে থাকা পরিবারের কষ্ট

বিদেশে কাজ করা শ্রমিকেরা প্রায়ই দুই বা তিন বছর পরপর বাড়ি ফিরতে পারেন। ফলে বহু স্ত্রীকে দীর্ঘ সময় স্বামীর অনুপস্থিতিতে সন্তানদের পড়াশোনা, বাড়ির দায়িত্ব এবং বয়স্ক শ্বশুর-শাশুড়ির দেখভাল করতে হয়।

গ্রামের এক নারী জানান, স্বামী দূরে থাকায় মানসিক শূন্যতা সামলানো খুব কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় নিজের পরিবারেও যাওয়া সম্ভব হয় না, কারণ সেখানেও পুরুষ সদস্যরা বিদেশে কাজ করেন।

Missiles and drones strike at the heart of a village in Odisha - The Hindu

উদ্বেগ বাড়ছে প্রশাসনের কাছেও

ওড়িশা সরকারের কাছে ইতিমধ্যে গালফ অঞ্চলে আটকে পড়া বহু শ্রমিকের পরিবারের কাছ থেকে ফোন এসেছে। প্রশাসন পরিস্থিতি নজরে রাখছে এবং প্রয়োজনে তাদের নিরাপদে দেশে ফেরাতে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে।

তবে গ্রামের মানুষ মনে করেন, যদি স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান থাকত, তাহলে তাদের প্রিয়জনদের এত দূরে বিপদের মুখে কাজ করতে যেতে হতো না।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

ট্রাম্প ঘনিষ্ঠতায় পাকিস্তানের উত্থান: কূটনীতি থেকে ব্যবসায় নতুন শক্তির বার্তা

যুদ্ধের আতঙ্কে ভিডিও কলের গ্রাম: ওড়িশার মানিকাপুরে গালফে থাকা প্রিয়জনদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় পরিবার

০৬:৪৪:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬

ওড়িশার গঞ্জাম জেলার ছোট্ট গ্রাম মানিকাপুরে গত কয়েক দিনে এক অদ্ভুত দৃশ্য তৈরি হয়েছে। প্রায় প্রতিটি বাড়ির মোবাইলের পর্দা দিনরাত জ্বলছে। মা ছেলেকে বাড়ি ফিরতে বলছেন, স্ত্রী স্বামীকে সাবধানে থাকতে অনুরোধ করছেন, আর বোনেরা ভাইদের বলছেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে অর্থ উপার্জনের প্রয়োজন নেই। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের প্রভাব এখন সরাসরি এসে পৌঁছেছে এই দূরবর্তী গ্রামেও।

যুদ্ধের খবরেই বদলে গেছে গ্রামের জীবন

ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই মানিকাপুরের প্রায় প্রতিটি পরিবার উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছে। গ্রামের প্রায় সাতশো পঞ্চাশটি পরিবারের অধিকাংশেরই অন্তত একজন সদস্য গালফ অঞ্চলে কাজ করেন। ফলে যুদ্ধের খবর এলেই গ্রামজুড়ে উৎকণ্ঠা বাড়ে।

অনেক পরিবার এখন প্রায় প্রতিদিন ভিডিও কলে কথা বলছে। কেউ জানতে চাইছেন তাদের ছেলেরা নিরাপদে আছে কি না, কেউ আবার স্বামীদের দ্রুত দেশে ফেরার অনুরোধ করছেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই অপেক্ষা দীর্ঘই হচ্ছে।

Missiles and drones strike at the heart of a village in Odisha - The Hindu

বিদেশে কাজই গ্রামের অর্থনীতির ভরসা

মানিকাপুর পঞ্চায়েতের প্রধান উদয়নাথ বারিক নিজেও বহু বছর বিদেশে কাজ করেছেন। তার মতে, ভারতের তুলনায় গালফ অঞ্চলে মজুরি বেশি হওয়ায় গ্রামের তরুণেরা সেখানে কাজ করতে আগ্রহী হন। অনেকেই মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকের পরেই বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

বিদেশে থাকা শ্রমিকেরা মাসে প্রায় কুড়ি হাজার থেকে ষাট হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়িতে পাঠান। এই অর্থেই অনেক পরিবারের জীবনযাত্রা চলে এবং গ্রামের বহু বাড়ি পাকা দোতলা বাড়িতে পরিণত হয়েছে।

যুদ্ধের আতঙ্কে পরিবারগুলোর দিন কাটছে উদ্বেগে

গ্রামের বাসিন্দা নমিতা সিং জানান, তার দুই ছেলে জর্ডানে কাজ করেন। আগে তিনি সংবাদ খুব একটা দেখতেন না, কিন্তু এখন প্রতিদিন যুদ্ধের খবর দেখতে বাধ্য হচ্ছেন। ছেলেরা কখনো কখনো আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র আটকানোর দৃশ্য কিংবা বিস্ফোরণের ভিডিও পাঠায়। প্রতিবার কথোপকথনের শেষে তারা মাকে আশ্বস্ত করে বলে যে তারা নিরাপদে আছে।

Missiles and drones strike at the heart of a village in Odisha - The Hindu

অন্যদিকে ষাটোর্ধ্ব রিনা জেনা প্রতিদিন স্মার্টফোনে ছেলের সঙ্গে কথা বলেন। তার ছেলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে নিরাপত্তা কর্মী হিসেবে কাজ করেন। টেলিভিশনে যুদ্ধের খবর দেখলেই তিনি ছেলেকে ফোন করে সতর্ক থাকতে বলেন।

বিদেশে কঠিন জীবন, তবু ফিরতে পারছেন না অনেকে

বিদেশে কাজ করা অনেক তরুণের জীবন সহজ নয়। জর্ডানে কর্মরত তেইশ বছর বয়সী অজয় জানান, প্রায় বারো থেকে তেরো ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। একটি ছোট ঘরে আটজন পর্যন্ত শ্রমিক থাকেন। খাবারও সব সময় পছন্দসই হয় না। তবু পরিবারের জন্য কিছু টাকা সঞ্চয় করার আশায় তারা এই কষ্ট সহ্য করেন।

অনেক শ্রমিক তাদের পাসপোর্ট নিয়োগকর্তার কাছে জমা রাখেন। ফলে হঠাৎ দেশে ফিরতে চাইলে নানা জটিলতার মুখে পড়তে হয়। তাছাড়া বিমানের টিকিট কেনার মতো অর্থও অনেক সময় তাদের কাছে থাকে না।

সামাজিক চাপও বাড়ায় বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা

Missiles and drones strike at the heart of a village in Odisha - The Hindu

গ্রামে বিদেশে কাজ করার পেছনে সামাজিক কারণও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের জন্য পাকা বাড়ি তৈরি করা কিংবা মেয়েদের বিয়ের খরচ জোগাড় করার জন্য অনেকেই বিদেশে কাজ করতে যান। বিয়ের সময় নগদ অর্থ, গয়না ও বড় আয়োজনের ভোজের খরচ অনেক পরিবারের জন্য বড় চাপ তৈরি করে।

এই পরিস্থিতিতে বহু পরিবার ঋণ নেয় এবং পরে সেই ঋণ শোধ করার জন্য পরিবারের পুরুষ সদস্যদের বিদেশে পাঠায়।

পিছনে থাকা পরিবারের কষ্ট

বিদেশে কাজ করা শ্রমিকেরা প্রায়ই দুই বা তিন বছর পরপর বাড়ি ফিরতে পারেন। ফলে বহু স্ত্রীকে দীর্ঘ সময় স্বামীর অনুপস্থিতিতে সন্তানদের পড়াশোনা, বাড়ির দায়িত্ব এবং বয়স্ক শ্বশুর-শাশুড়ির দেখভাল করতে হয়।

গ্রামের এক নারী জানান, স্বামী দূরে থাকায় মানসিক শূন্যতা সামলানো খুব কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় নিজের পরিবারেও যাওয়া সম্ভব হয় না, কারণ সেখানেও পুরুষ সদস্যরা বিদেশে কাজ করেন।

Missiles and drones strike at the heart of a village in Odisha - The Hindu

উদ্বেগ বাড়ছে প্রশাসনের কাছেও

ওড়িশা সরকারের কাছে ইতিমধ্যে গালফ অঞ্চলে আটকে পড়া বহু শ্রমিকের পরিবারের কাছ থেকে ফোন এসেছে। প্রশাসন পরিস্থিতি নজরে রাখছে এবং প্রয়োজনে তাদের নিরাপদে দেশে ফেরাতে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে।

তবে গ্রামের মানুষ মনে করেন, যদি স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান থাকত, তাহলে তাদের প্রিয়জনদের এত দূরে বিপদের মুখে কাজ করতে যেতে হতো না।