কৃষকদের মধ্যে একটি সাধারণ ধারণা আছে—নিজের চাষাবাদ ভালো হলেও পাশের খামারের কাজ আরও ভালো হতে পারত। কেউ হয়তো খুব তাড়াতাড়ি গম বপন করেছে, কেউ আবার আগাছা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ। এই তুলনার মনোভাব এখন শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং দেশভিত্তিক কৃষিনীতি মূল্যায়নেও দেখা যাচ্ছে। কিছু দেশ কম খরচে বেশি উৎপাদনশীলতা অর্জন করছে, আবার পরিবেশ দূষণও কমাচ্ছে। এই জায়গায় এখন ইংল্যান্ড নিজেকে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে ভাবার সুযোগ পাচ্ছে।
ব্রেক্সিটের পর কৃষিনীতি: বড় পরিবর্তন
অনেকে মনে করেছিলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পর উন্নত নীতি আসবে—যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা সত্য হয়নি। তবে কৃষিক্ষেত্রে এই দাবি অনেকটাই সত্য প্রমাণিত হয়েছে। আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাধারণ কৃষিনীতি অনুযায়ী, কৃষকদের জমির পরিমাণ অনুযায়ী ভর্তুকি দেওয়া হতো।
কিন্তু ব্রেক্সিটের পর ইংল্যান্ড এই পদ্ধতি থেকে সরে এসেছে। ধীরে ধীরে এই ভর্তুকি কমিয়ে এখন প্রায় বন্ধের পথে, যা আগামী বছর পুরোপুরি তুলে দেওয়া হবে। যদিও স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড এখনও পুরোনো পদ্ধতিতে চলছে।
পরিবেশভিত্তিক কৃষি সহায়তা
এখন ইংল্যান্ডে কৃষকদের সরকারি সহায়তা পেতে হলে পরিবেশবান্ধব কাজ করতে হয়। যেমন—ঝোপঝাড় তৈরি, পাখি ও কীটপতঙ্গের জন্য উপযোগী গাছ লাগানো, মাটির স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ইত্যাদি।
এই ধরনের “অ্যাগ্রি-এনভায়রনমেন্ট” প্রকল্প আগে থেকেই ছিল, তবে ইংল্যান্ড এখন প্রায় পুরো ভর্তুকি এই খাতে সরিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে মোট ভর্তুকির মাত্র এক-চতুর্থাংশ এই ধরনের প্রকল্পে যায়।
প্রাথমিক ফলাফল: ইতিবাচক ইঙ্গিত
যদিও এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না যে এই নীতি জীববৈচিত্র্য বাড়াচ্ছে বা কৃষিখাতে কার্বন নির্গমন কমাচ্ছে, তবুও প্রাথমিক লক্ষণ ইতিবাচক।
গবাদিপশুর সংখ্যা কমছে, গাছ লাগানো বাড়ছে এবং কিছু জমি ফাঁকা রাখা হচ্ছে। এতে খাদ্য উৎপাদনে বড় ধাক্কা লাগেনি। কারণ কৃষকেরা সাধারণত কম উর্বর বা কঠিন জমিগুলোই পরিবেশ প্রকল্পে দিচ্ছেন।

ভর্তুকি কমলেও কৃষকেরা টিকে আছে
শুরুতে আশঙ্কা ছিল—ভর্তুকি কমলে কৃষকেরা সমস্যায় পড়বে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। প্রায় এক লাখ কৃষকের মধ্যে মাত্র ১,২০০ জন সরকারি সহায়তা নিয়ে পেশা ছেড়েছেন, যাদের অনেকেই আগেই এমন পরিকল্পনা করেছিলেন।
লাভের হারও স্থিতিশীল রয়েছে, যদিও এতে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি—বিশেষ করে একটি বড় শস্য উৎপাদনকারী দেশে রাশিয়ার আগ্রাসনের প্রভাব রয়েছে।
এছাড়া কৃষকেরা নতুনভাবে আয় বাড়ানোর পথ খুঁজে নিয়েছেন। কেউ জমি ভাড়া দিচ্ছেন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য, আবার কেউ বাড়ি ভাড়া দিচ্ছেন পর্যটকদের কাছে।
জমির বাজারে পরিবর্তন
ভর্তুকি বন্ধ হওয়ায় কৃষিকাজ কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়েছে, ফলে জমির দাম বৃদ্ধির হার কমেছে। ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট ভোটের পর ইংল্যান্ডে আবাদি জমির দাম বেড়েছে ১২%।
অন্যদিকে স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসে, যেখানে পুরোনো ভর্তুকি ব্যবস্থা এখনও চালু আছে, সেখানে জমির দাম যথাক্রমে ৪৬% ও ৩৩% বেড়েছে।
এতে দক্ষ কৃষকদের জন্য জমি কেনা বা খামার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নীতির সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনা
এই নীতিকে আরও কার্যকর করা সম্ভব। সরকার চাইলে নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে—যেমন কোনো এলাকায় পাখির সংখ্যা বাড়ানো বা বন্যা কমানো—এবং কৃষকদের সেই লক্ষ্য পূরণের জন্য প্রতিযোগিতামূলক প্রস্তাব দিতে উৎসাহিত করতে পারে।
বর্তমান সরকার কিছু সীমাবদ্ধ সিদ্ধান্তও নিয়েছে, যেমন প্রতি খামারে পরিবেশভিত্তিক ভর্তুকির সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ। এটি বড় জমির মালিকদের জন্য কিছুটা বাধা তৈরি করলেও পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকে তা খুব যৌক্তিক নয়।
দ্রুত পরিবর্তন, কম প্রতিরোধ
ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো—খুব অল্প সময়ের মধ্যে কৃষকদের নতুন ব্যবস্থায় নিয়ে আসা এবং তাতে বড় ধরনের প্রতিবাদ না হওয়া। যদিও কিছু কৃষক ট্রাক্টর নিয়ে ওয়েস্টমিনস্টারে প্রতিবাদ করেছেন, কিন্তু তা ছিল উত্তরাধিকার কর নিয়ে, ভর্তুকি কমানো নিয়ে নয়।
আন্তর্জাতিক তুলনা: নিউজিল্যান্ডের অভিজ্ঞতা
আরও কঠোর উদাহরণ রয়েছে। ১৯৮০-এর দশকে নিউজিল্যান্ড সব কৃষি ভর্তুকি বাতিল করে দেয়। এতে একটি উদ্ভাবনী ও বাজারভিত্তিক কৃষি খাত তৈরি হয়।
তবে সেখানে এখন পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে, বিশেষ করে গবাদিপশু থেকে নির্গত মিথেন গ্যাসের কারণে। কোনো প্রণোদনা না থাকায় সরকার সমস্যার সমাধানে হিমশিম খাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে ইংল্যান্ডের তুলনামূলক নরম ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি ভবিষ্যতে আরও সফল হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















