‘আমি হলুদ আর সবুজ—দুই ধরনের বিষই ছিটাতাম,’ বলেন হার্না। ২০০৬ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত প্রায় ছয় বছর তিনি ইন্দোনেশিয়ার বোর্নিও অঞ্চলের সেন্ট্রাল কালিমান্তানে একটি তেলপাম বাগানে কাজ করেছেন। সেখানে তিনি ‘রক্ষণাবেক্ষণ দল’-এর সদস্য ছিলেন। তিনি যে ‘সবুজ বিষ’-এর কথা বলছেন, সেটি গ্রামক্সোন—একটি অত্যন্ত বিষাক্ত আগাছানাশক, যার মূল উপাদান প্যারাকোয়াট। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক (বর্তমানে চীনের মালিকানাধীন) বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান সিনজেন্টা এটি বাজারজাত করে। শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাবের কারণে ২০০৭ সাল থেকেই ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্যারাকোয়াট নিষিদ্ধ।
হার্না বলেন, ‘কাজের পর প্রায়ই বমি বমি ভাব, বমি আর মাথা ঘোরা হতো। কেন হতো জানি না, তবে আমার সহকর্মীদেরও একই সমস্যা ছিল। আমি জানতাম এগুলো বিপজ্জনক রাসায়নিক, তাই ব্যবহার করতে সবসময় ভয় পেতাম।’ একদিন প্যারাকোয়াট পানির সঙ্গে মিশানোর সময় তার হাতে এক ফোঁটা পড়ে যায়, যা থেকে এমন ক্ষত তৈরি হয় যে সেরে উঠতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যায়।
পেনিয়াং গ্রামে নিজের ঘরের মেঝেতে বসে থাকা হার্নাকে ক্লান্ত দেখায়। গরম ও আর্দ্রতায় পরিবেশ ভারী। পাশে থাকা পাখাও যেন কোনো স্বস্তি দিতে পারে না। এমন পরিস্থিতিতে তিনি ও তার সহকর্মীরা কাঁধে প্রায় ১৩ কেজি ওজনের ট্যাংক নিয়ে টানা আট ঘণ্টা কাজ করতেন—মুখে মাস্ক রেখেই।
হার্না বড় হয়েছেন বনের পাশে ছোট্ট এক গ্রামে। তাদের পরিবার শিকার ও চাষাবাদের ওপর নির্ভর করত। কিন্তু ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে তেলপাম বাগান স্থাপনের ফলে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা দ্রুত খারাপ হয়ে যায়। তারা শুধু জমিই হারায়নি, বনেও প্রবেশাধিকার হারায়। বাধ্য হয়ে হার্না একটি বাগানে কাজ নেন। সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত তিনি বিষাক্ত আগাছানাশক ছিটাতেন, যাতে গাছ দ্রুত বাড়তে পারে।
বছরের পর বছর তিনি অসুস্থতায় ভুগেছেন, কখনো এতটাই খারাপ হতো যে কয়েক দিন বিছানায় থাকতে হতো। বাগানের ডাক্তার তাকে সাধারণত গুরুত্ব না দিয়ে শুধু প্যারাসিটামল বা বমি রোধের ওষুধ দিতেন।
একসময় তার পেটের ভেতর তীব্র ব্যথা শুরু হয়—‘যেন ছুরি ঢুকছে।’ ডাক্তার ধারণা করেছিলেন এটি ফুসফুসের সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। কিন্তু ব্যয়বহুল পরীক্ষার কারণে প্রকৃত কারণ জানা যায়নি। শেষ পর্যন্ত তিনি চাকরি ছেড়ে দেন।
প্যারাকোয়াটের সরাসরি স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে শ্বাসকষ্ট, তীব্র দাহ, ত্বক ও চোখের জ্বালা। যুক্তরাষ্ট্রে এটি পারকিনসন রোগের সঙ্গেও যুক্ত বলে ধারণা করা হয়। ইন্দোনেশিয়ায় নিয়ম অনুযায়ী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শ্রমিকদের সুরক্ষা সরঞ্জামসহ এটি ব্যবহার করার কথা, কিন্তু বাস্তবে তা খুব কমই মানা হয়।
বর্তমানে ৪৮ বছর বয়সী হার্না, ছয় সন্তানের মা। তিনি বলেন, ‘এই বাগানগুলো থাকার কারণে অন্য কোনো কাজ নেই।’
তার বাড়ির পাশ দিয়ে চলা ট্রান্স কালিমান্তান মহাসড়কে সারাক্ষণ ট্রাক চলাচল করে। একদিকে ফল যাচ্ছে কারখানায়, অন্যদিকে প্রক্রিয়াজাত তেল যাচ্ছে বন্দরে—রপ্তানির জন্য।
ইউরোপে তৈরি, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে
ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাম তেল রপ্তানিকারক দেশ। ২০২২ সালে বৈশ্বিক রপ্তানির প্রায় ৫০ শতাংশই ছিল তাদের দখলে, এরপর মালয়েশিয়া। খাদ্য থেকে প্রসাধনী, এমনকি জ্বালানি উৎপাদনেও এই তেল ব্যবহৃত হয়। এর প্রায় ১০ শতাংশ ইউরোপে যায়।
পশ্চিম আফ্রিকার এই গাছটি ডাচ ঔপনিবেশিক আমলে ইন্দোনেশিয়ায় আনা হয়। কয়েক দশকের মধ্যে একফসলি বাগান বিস্তারের ফলে বোর্নিওর বিশাল বনভূমি ধ্বংস হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই ধ্বংসের গতি কিছুটা কমলেও ২০২৩ সালে আবার বাড়তে শুরু করেছে।
পাম তেল উৎপাদন ও প্যারাকোয়াট ব্যবহারের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ২০২০ সালে ইন্দোনেশিয়া প্রায় পাঁচ লাখ ডলারের কীটনাশক আমদানি করে। এই বাজার গত দশকে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।
২০১৯ সালে দেশটি যুক্তরাজ্য থেকে ২,৩০০ টন প্যারাকোয়াট আমদানি করে, যার বড় অংশ তৈরি হয় সিনজেন্টার কারখানায়। ২০১৭ সালে চীনা প্রতিষ্ঠান কেমচায়না সিনজেন্টা অধিগ্রহণের পর চীন থেকেও উৎপাদন ও রপ্তানি বেড়েছে।
যেসব দেশ এই রাসায়নিক তৈরি ও রপ্তানি করে—চীন, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য—তারা নিজের দেশে এটি নিষিদ্ধ করেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতোই। তবুও ইউরোপ বিশ্বে সবচেয়ে বড় কীটনাশক রপ্তানিকারক হিসেবে থেকে গেছে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।
পরিবেশগত বিপর্যয়
কালিমান্তানে তেলপাম বাগান ও অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের প্রভাব স্থানীয় মানুষ সরাসরি দেখছে।
হার্নার বাড়ি থেকে অল্প দূরের ব্যাংকাল গ্রামে এখনো অনেক মানুষ বাগান আসার আগের সময়ের কথা মনে করতে পারেন। সেম্বুলুহ হ্রদের পাশে অবস্থিত এই গ্রামে প্রায় ৪,০০০ মানুষ বাস করে। তারা আগে চাষাবাদ ও মাছ ধরার ওপর নির্ভর করত এবং হ্রদের পানি পান করত। এখন তারা জমি হারিয়েছে এবং পরিষ্কার পানির জন্য সংগ্রাম করছে।
গ্রামের নেতা সাংকাই রেওয়া বলেন, ‘কোনো আলোচনা ছাড়াই হঠাৎ করে কোম্পানিগুলো এসে জমি দখল করে নেয়।’ ১৯৯০-এর দশকে তারা এক কোম্পানিকে প্রতিরোধ করতে পারলেও ২০০৫ সালে আরেক কোম্পানির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পরাজিত হয়।
তিনি বলেন, ‘আমাদের চারপাশে আগে শুধু বন ছিল। এখন দেখুন—কিছুই নেই।’ এখন ব্যাংকাল চারদিকে বাগান ও কারখানায় ঘেরা।
‘আমরা দেখেছি পানির রং বদলে গেছে। এই পানি দিয়ে ধোয়া যায় না—চুলকানি হয়, ফুসকুড়ি ওঠে। পুরো পরিবেশই হুমকির মুখে,’ বলেন তিনি।
৬০ বছর বয়সী জেলে নুরেদিন বলেন, ‘আগে মাছ বড় ছিল, সহজে পাওয়া যেত। এখন অনেক প্রজাতি হারিয়ে যাচ্ছে।’ জলজ আগাছা বেড়ে যাওয়ায় মাছ ধরা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
২০১৮ সালে সরকারি পরীক্ষায় হ্রদের পানি স্বাভাবিক বলা হলেও পরিবেশকর্মীরা তা মানতে রাজি নন। তারা বলেন, প্রকৃত তথ্য গোপন করা হয়েছে।
কৃষক থেকে প্রতিবাদী
‘পাম তেল মানেই গ্রামক্সোন, আর গ্রামক্সোন মানেই পাম তেল,’ বলেন ব্যাংকাল গ্রামের কৃষক জেমস ওয়াট। তিনি আগে রাবার, ফল ও সবজি চাষ করতেন। কিন্তু বাগান বিস্তারের কারণে তাকেও পাম চাষে যেতে হয়। ২০১৫ সালে তিনি প্রথম প্যারাকোয়াট ব্যবহার শুরু করেন।
তিনি বলেন, ‘আমি শক্তিশালী আগাছানাশক খুঁজছিলাম। দোকানদার আমাকে এটি দেয়।’ এখন এটি প্রায় সব কৃষকের ঘরে পাওয়া যায়।
তবে ওয়াট শুধু কৃষক নন, তিনি একজন কর্মীও। প্রায় অর্ধেক জীবন তিনি এই শিল্পের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন। ২০২০ সালে একটি প্রতিবাদের পর তাকে ১০ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে এক প্রতিবাদে পুলিশের গুলিতে গিজিক নামের এক ব্যক্তি নিহত হন। জমি দখলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে বহু মানুষ মারা গেছে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো।
ওয়াট বলেন, ‘সরকার যখন বলে পাম তেল উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি আনে, আমি তা বুঝি না। আমাদের সত্যিকারের সমৃদ্ধি ছিল আগে—আমরা নিজেরাই সব উৎপাদন করতাম, মাছ ধরতাম, শিকার করতাম। এখন সব শেষ।’
এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি জার্নালিজমফান্ড ইউরোপের সহায়তায় সম্পন্ন হয়েছে।
ড্যানিয়েলা সালা, আদি রেনালদি ও বুদি বাসকোরো 


















