যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতের এক ঐতিহাসিক রায়ের পর ট্রাম্প প্রশাসনের জরুরি শুল্কনীতি বড় ধাক্কা খেয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষের পকেটে স্বস্তি আসবে, নাকি নতুন করে মূল্য অস্থিরতা তৈরি হবে—তা নিয়ে এখনো পরিষ্কার কোনো চিত্র নেই। বরং ব্যবসা-বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং ভোক্তা দামের ওপর এর প্রভাব নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা।
সুপ্রিম কোর্টের রায় কী বলছে
গত ২০ ফেব্রুয়ারি ৬-৩ ভোটে আদালত জানায়, ১৯৭৭ সালের জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের আওতায় জাতীয় জরুরি অবস্থা দেখিয়ে আমদানি শুল্ক আরোপের ক্ষমতা ট্রাম্পের ছিল না। এর ফলে গত বছরের তথাকথিত ‘মুক্তি দিবস’ শুল্কসহ চীন, মেক্সিকো ও কানাডার ওপর আরোপিত বেশ কিছু শুল্ক কার্যত বাতিল হয়ে যায়।
তবে সব শুল্ক উঠে যায়নি। ১৯৬২ সালের বাণিজ্য সম্প্রসারণ আইনের আওতায় জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তিতে আরোপিত ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের শুল্ক এখনো বহাল রয়েছে।
নতুন শুল্ক, নতুন জটিলতা
রায়ের পরও ট্রাম্প প্রশাসন থেমে নেই। ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের অন্য একটি ধারা ব্যবহার করে সব দেশের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়, যা পরে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। যদিও এই শুল্ক সর্বোচ্চ ১৫০ দিনের জন্য কার্যকর, তবুও এটি নতুন আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
এদিকে দ্রুত তদন্ত চালিয়ে নতুন শুল্ক আরোপের প্রস্তুতিও নিচ্ছে প্রশাসন। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তিগুলোও অনিশ্চয়তায় পড়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তি অনুমোদন স্থগিত রেখেছে।
বিশ্ববাজারে কে লাভবান, কে ক্ষতিগ্রস্ত
এই পরিবর্তনে কিছু দেশ বাড়তি চাপের মুখে পড়তে পারে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ আগে যেসব ছাড় পেয়েছিল, এখন তাদের শুল্ক বেড়ে যেতে পারে। একইভাবে সিঙ্গাপুর ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোর ক্ষেত্রেও শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫ শতাংশ হয়েছে।
অন্যদিকে চীন, ব্রাজিল ও ভারতের মতো দেশ তুলনামূলকভাবে সুবিধা পেতে পারে, কারণ আগের উচ্চ শুল্কের জায়গায় এখন কম হারে শুল্ক প্রযোজ্য হচ্ছে।
ভোক্তাদের জন্য কী অর্থ বহন করছে
এই রায়ের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—দাম কমবে, নাকি বাড়বে? অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত শুল্কের খরচ ইতোমধ্যে পণ্যের দামে যুক্ত করেছে। ফলে শুল্ক বাতিল হলেও সেই অর্থ সরাসরি ভোক্তাদের কাছে ফেরত আসবে কি না, তা অনিশ্চিত।
ডেমোক্র্যাট নেতারা প্রায় ১৩০ বিলিয়ন ডলারের শুল্ক ফেরতের দাবি তুলেছেন। প্রস্তাবিত আইনে সুদসহ প্রায় ১৭৫ বিলিয়ন ডলার ফেরত দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যা মূলত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেওয়া হবে। তবে কিছু নেতা সরাসরি ভোক্তাদের অর্থ ফেরতের দাবিও তুলেছেন।
ফেরত পাওয়া নিয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের আশঙ্কা
ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউজম অভিযোগ করেছেন, এই শুল্কের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের খাদ্য, আসবাব ও গাড়ির ওপর এক বছর ধরে বেআইনি কর চাপানো হয়েছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন এখনই কোনো অর্থ ফেরতের ইঙ্গিত দেয়নি। বরং বিষয়টি আদালতে দীর্ঘ সময় ঝুলে থাকতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
একজন বিচারপতি সতর্ক করে বলেছেন, শুল্ক ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া নিজেই বড় বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে।
সামনে কী হতে পারে
সব মিলিয়ে সুপ্রিম কোর্টের এই রায় শুল্কনীতিতে বড় পরিবর্তন আনলেও অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে। নতুন শুল্ক, আইনি লড়াই এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির টানাপোড়েন—সবকিছু মিলিয়ে আগামী দিনে ভোক্তাদের জন্য পণ্যের দাম ওঠানামা করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















