তেহরানের আকাশে যুদ্ধের গর্জন শোনার পর মুহূর্তেই বদলে যায় মানুষের অনুভূতি। প্রথমে উল্লাস, তারপর ধীরে ধীরে ভয় আর অনিশ্চয়তা—এই দ্বৈত বাস্তবতায় এখন দিন কাটছে ইরানের সাধারণ মানুষের।
প্রথম আঘাতেই বদলে যায় দৃশ্য
তেহরানের এক ঠিকাদার সালমান তখন স্নান শেষে বের হচ্ছিলেন। হঠাৎ নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়া যুদ্ধবিমানের শব্দে চমকে ওঠেন। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখেন, সর্বোচ্চ নেতার কম্পাউন্ডের ওপর উঠছে কালো ধোঁয়ার স্তম্ভ। সেটি ছিল প্রথম দফার বিমান হামলার আঘাত।
এই ঘটনার পরপরই দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আনন্দের ঢেউ। মাশহাদের এক প্রকৌশলী মেহেদি বলেন, জীবনে কখনো এমন অনুভূতি হয়নি। তার ভাষায়, এমন একজনের মৃত্যু ঘটেছে, যিনি তার সব স্বপ্ন ধ্বংস করেছিলেন।
তবে এই উল্লাসের মাঝেও ছিল সংশয়। তেহরানের এক আইনজীবী হাসান বলেন, মনে হচ্ছে যেন স্বপ্ন দেখছেন, কিন্তু ভয়ও আছে—এই মৃত্যু সত্ত্বেও শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে কি না, সেই অনিশ্চয়তা তাকে পুরোপুরি আনন্দিত হতে দিচ্ছে না।
বাইরের আহ্বান, ভেতরের দ্বিধা
হামলার মাঝেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি বার্তায় ইরানিদের ঘরে থাকার আহ্বান জানান এবং পরে নিজেদের সরকার নিজেদের হাতে নেওয়ার কথা বলেন। এই বার্তা শুনে তেহরানের ব্যবসায়ী মহসেন পরিবার নিয়ে শহর ছাড়ার পরিকল্পনা বাতিল করেন। তার যুক্তি, যদি পরিবর্তনের মুহূর্ত আসে, তাহলে রাজধানীতেই থাকা জরুরি।
বাস্তবতার ধাক্কায় ভেঙে পড়া আশা
কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়। তেহরানের এক কর্মচারী সোরুর প্রথমে এই হামলাকে স্বাগত জানালেও, পরে এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। একটি বিমান হামলায় পাশের ভবন ধ্বংস হয়ে গেলে তিনি রক্তাক্ত দৃশ্যের মধ্যে পড়ে যান। সেই ঘটনার পর থেকে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন এবং আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
তার মতো অনেকেই এখন বলছেন, বাইরের শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করাই এখন প্রধান চিন্তা।
নতুন আতঙ্ক: ভাঙনের আশঙ্কা
এরই মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে আরেকটি উদ্বেগ। বিভিন্ন সংখ্যালঘু অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা দেওয়ার খবর মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। তেহরানের প্রকৌশলী বেহরুজ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সরকার এই ধরনের ভয়ের কথা বলে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। কিন্তু এখন সেই আশঙ্কা বাস্তবে পরিণত হতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।
তাবরিজের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা এক ব্যবসায়ী হেশমত আশঙ্কা করছেন, কোনো সংঘর্ষ শুরু হলে তা দ্রুত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে। এতে দেশজুড়ে সহিংসতা বেড়ে যেতে পারে।
বেহরুজ আরও বলেন, যদি এক অঞ্চলে সংঘাত শুরু হয়, তাহলে তা অন্য অঞ্চলগুলোতেও ছড়াবে। তুর্কি, বালুচ, আরব—সবাই জড়িয়ে পড়তে পারে। এতে ইরান ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
স্বাধীনতার স্বপ্ন বনাম রাষ্ট্রের অস্তিত্ব
অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে বর্তমান শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছেন। তাদের লক্ষ্য একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক ইরান। কিন্তু এখন তাদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই পরিবর্তনের লড়াইয়ে ইরান নিজেই টিকে থাকবে তো?
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















