প্রকৃতির আরও গভীরে
ভারতের বনভিত্তিক পর্যটনে এখন বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আগে যেখানে জিপ সাফারি ছিল প্রধান আকর্ষণ, এখন অনেক পর্যটক বেছে নিচ্ছেন ভিন্ন অভিজ্ঞতা। তারা যাচ্ছেন এমন গাইড, প্রাকৃতিকবিদ ও বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রীদের সঙ্গে, যারা বনকে শুধু দেখান না, বরং বোঝাতে শেখান। পাখির ডাক, প্রাণীর আচরণ কিংবা পরিবেশের সূক্ষ্ম পরিবর্তন—সবকিছু মিলিয়ে এক নতুন ধরনের শিক্ষামূলক ভ্রমণ গড়ে উঠছে।
প্রসিদ্ধ শিকারি ও লেখক জিম করবেট তার বইতে বর্ণনা করেছিলেন, কীভাবে বানরের সতর্কবার্তা শুনে তিনি বাঘের অবস্থান খুঁজে পেয়েছিলেন। আজও অভিজ্ঞ গাইডরা একই কথা বলেন—বনে চোখ, কান আর ঘ্রাণই সবচেয়ে বড় সহায়ক।
বন্য পর্যটনের প্রসার
পরিসংখ্যান বলছে, ভারতে বন্যপ্রাণী পর্যটনের বাজার দ্রুত বাড়ছে। ২০২৩ সালে এর মূল্য ছিল প্রায় ১১.২ বিলিয়ন ডলার, এবং ২০৩০ পর্যন্ত প্রতি বছর প্রায় ১০ শতাংশ হারে বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত জাতীয় উদ্যানগুলোতে পর্যটকদের ভিড় থাকে সবচেয়ে বেশি। তবে অনেকেই এখন প্রচলিত সাফারির বাইরে গিয়ে প্রকৃতিকে কাছ থেকে বোঝার চেষ্টা করছেন।

অসমের প্রত্যন্ত অভিজ্ঞতা
অসমের দিমা হাসাও জেলার হাজং গাজাম এলাকায় রয়েছে বিরল কচ্ছপের আবাসস্থল। সেখানে পৌঁছাতে ঘন বাঁশঝাড় পেরিয়ে যেতে হয়। স্থানীয় প্রধান জয়পেন কেম্পরাই পর্যটকদের পথ দেখান, বিপজ্জনক মাকড়সার জাল এড়িয়ে চলতে সাহায্য করেন এবং বন সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন।
তিনি জানান, এই অঞ্চলের বাঁশ আর্দ্রতা ধরে রাখে, যা কচ্ছপের জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে। শত বছরের পুরোনো গাছও এখানে রয়েছে। তার মতো মানুষের ব্যাখ্যা ছাড়া বনের অভিজ্ঞতা অনেকটাই অসম্পূর্ণ থেকে যেত।
স্থানীয় তরুণদের উদ্যোগ
এই ধরনের উদ্যোগ দেখে দিমা হাসাওয়ের অনেক তরুণ এখন গাইড হিসেবে কাজ করছেন। তারা শুধু পথ দেখান না, বরং স্থানীয় সংস্কৃতি ও প্রকৃতির সঙ্গে পর্যটকদের পরিচয় করিয়ে দেন। যেমন, বাঁশের নলে তৈরি চা পান করা বা জলপ্রপাতের পথে ট্রেকিং—এসব অভিজ্ঞতা ভ্রমণকে করে তোলে আরও সমৃদ্ধ।
প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার অভিজ্ঞতা
অসমের নাগাঁও এলাকায় এক প্রশিক্ষিত পর্বতারোহী তার প্রকৃতি-নির্ভর ক্যাম্পে পর্যটকদের নিয়ে যান। এখানে বিলাসিতা নেই, আছে প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সংযোগ। জলপ্রপাত ভ্রমণ, ট্রেকিং এবং দড়ি বেয়ে নামার মতো অভিজ্ঞতা পর্যটকদের নতুনভাবে প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত করে।
লাদাখে তুষার চিতার খোঁজ
লাদাখে একজন আলোকচিত্রী বহু বছর ধরে তুষার চিতার সন্ধানে কাজ করছেন। এই বিরল প্রাণী দেখা অত্যন্ত কঠিন, কারণ এটি পরিবেশের সঙ্গে এমনভাবে মিশে থাকে যে খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। তার নেতৃত্বে এখন আন্তর্জাতিক পর্যটকেরা অভিযানে অংশ নিচ্ছেন।
তিনি মনে করেন, এই ধরনের ভ্রমণ শুধু দর্শনের জন্য নয়, বরং প্রকৃতিকে বোঝার একটি প্রক্রিয়া। তিনি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে নৈতিকতার ওপর জোর দেন এবং কোনোভাবেই প্রাণীকে প্রলুব্ধ করে ছবি তোলার বিরোধিতা করেন।

বন পড়ার শিক্ষা
অভিজ্ঞ আলোকচিত্রীদের মতে, বনে প্রাণী খোঁজা মানে শুধু চোখে দেখা নয়, বরং পরিবেশের সংকেত বুঝতে পারা। পাখির ডাক, পাতার নড়াচড়া কিংবা নিঃশব্দ পরিবর্তন—এসবই গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়।
অনেকেই ছোট ছোট দল নিয়ে ভ্রমণ আয়োজন করছেন, যেখানে নিরাপত্তা, নৈতিকতা এবং পরিবেশ সংরক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এতে অংশগ্রহণকারীরা শুধু ছবি তোলেন না, বরং প্রকৃতিকে সম্মান করতে শেখেন।
অচেনা পথের আকর্ষণ
এই নতুন ধারা পর্যটকদের নিয়ে যাচ্ছে এমন সব স্থানে, যা প্রচলিত পর্যটন মানচিত্রে নেই। এসব জায়গায় প্রাণীকে প্রলুব্ধ করার মতো অনৈতিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় না। বরং প্রকৃতির স্বাভাবিক পরিবেশে প্রাণী দেখার অভিজ্ঞতাই এখানে মুখ্য।
উত্তর-পূর্ব ভারতের জীববৈচিত্র্য অনেক সময় গণ্ডারের মতো জনপ্রিয় প্রাণীর আড়ালে চাপা পড়ে যায়। অথচ এই অঞ্চলে প্রায় ৪৫ শতাংশ পরিযায়ী পাখি আসে। প্রাকৃতিকবিদরা তাই পর্যটকদের পাখি ও অন্যান্য জীবের স্বাভাবিক আবাসস্থলে নিয়ে গিয়ে পর্যবেক্ষণ শেখান।
প্রকৃতি থেকে শেখার পাঠ
এই ভ্রমণগুলো শুধু আনন্দের জন্য নয়, বরং শিক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। উদ্ভিদ, মাটি গঠন, জীববৈচিত্র্য—সবকিছু মিলিয়ে প্রকৃতির জটিল সম্পর্ক বোঝানো হয়।
শেষ পর্যন্ত এই অভিজ্ঞতা একটি বিষয় স্পষ্ট করে দেয়—যারা প্রকৃতিকে বোঝে, তারাই প্রকৃতিকে রক্ষা করতে বেশি আগ্রহী হয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















