ইরান এই যুদ্ধ শুরু করতে চায়নি, কিন্তু এখন এটি দীর্ঘায়িত করার জন্য তার নিজস্ব কৌশলগত কারণ তৈরি হয়েছে। এটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ তার হুমকি সত্ত্বেও তিনি হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করতে পারছেন না। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতি জ্বালানি মূল্যের উল্লম্ফনের চাপে কাঁপছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতারাও বিপাকে পড়েছেন, কারণ তাদের তেলের আয় কমে যাচ্ছে। ভবিষ্যতের মার্কিন প্রশাসনের জন্যও এটি একটি সতর্ক সংকেত—একবার হরমুজ বন্ধ হয়েছে, আবারও তা হতে পারে।
মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে এবং অবকাঠামো ধ্বংস হচ্ছে, তবুও তেলের উচ্চমূল্য ইরানের অর্থনীতিকে যুদ্ধের ব্যয় থেকে আংশিক সুরক্ষা দিচ্ছে। ইরান প্রায় প্রতিটি হামলার পাল্টা হামলা করেছে এবং প্রতিটি হুমকির জবাবে সমান হুমকি দিয়েছে। তাদের নেতৃত্বের যুক্তি ঠান্ডা কিন্তু হিসাবি—এই যুদ্ধকে এমন ব্যয়বহুল করে তুলতে হবে যাতে ভবিষ্যতে কেউ আর এমন সংঘাতে জড়াতে না চায়।
তেহরানের লক্ষ্য সরল—এই সংকট থেকে টিকে থাকা এবং ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা ঠেকানো। এর জন্য তারা যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, উপসাগরীয় দেশগুলোর স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এখন পর্যন্ত তারা অনেকটাই সফল। ইরান বুঝে গেছে, তুলনামূলক কম খরচে কীভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে জিম্মি করে রাখা যায়।
ইরানের জন্য এই সময়টি অস্তিত্বের প্রশ্ন। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে দেশটি উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল মুদ্রার মুখে পড়েছে। রাজনৈতিক বৈধতার সংকটও তৈরি হয়েছে, যা কঠোরভাবে দমন করা আন্দোলন এবং সামাজিক ও পরিবেশগত চাপের কারণে আরও বেড়েছে। পানির সংকট এতটাই তীব্র হয়েছে যে দেশের প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত সতর্ক করেছেন, তেহরান খালি করতে হতে পারে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং শাসন পরিবর্তনের প্রকাশ্য আলোচনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
এই অবস্থায় ইরান ধাপে ধাপে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখায়। জুনের স্বল্পস্থায়ী সংঘাতের মতো এটি প্রতীকী নয়; বরং বাস্তব ও ধারাবাহিক উত্তেজনা বৃদ্ধি। ইরান উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর জ্বালানি ও পর্যটন খাতে আঘাত করছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে তারা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে—যা আগে শুধু হুমকি ছিল, বাস্তবে কার্যকর করা হয়নি।
কেউ কেউ এই পদক্ষেপকে অযৌক্তিক মনে করলেও তেহরান এটিকে সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। যুদ্ধের শুরুতে ইরান আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত করে উৎপাদন সাময়িকভাবে ব্যাহত করে। কিন্তু ১৮ মার্চ ইসরায়েল ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালানোর পর ইরান আরও কঠোর পথে হাঁটে। এরপর তারা কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনায় আঘাত হানে, যা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির উদ্দেশ্যে করা হয়েছে বলে মনে হয়। বিশ্বের বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি স্থাপনায় হামলার ফলে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি এবং পাঁচ বছর পর্যন্ত মেরামতের প্রয়োজন হতে পারে। এতে ইরান দেখিয়েছে, তারা সমানভাবে পাল্টা আঘাত করতে সক্ষম।
ইরান এই সব কিছু তুলনামূলক কম খরচে করছে। তারা স্বল্পমূল্যের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপে ফেলছে। যেখানে ইরানের ড্রোনের দাম ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলার, সেখানে প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্রের দাম ৪ মিলিয়নেরও বেশি। তারা মাইন, ড্রোন ও বিস্ফোরক বোঝাই নৌকা ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলকে ভীত করছে। সহজভাবে বললে, খরচের দিক থেকে ইরান সুবিধাজনক অবস্থানে আছে।
যদিও তাদের অস্ত্র সীমাহীন নয়, তবুও সময়ের সঙ্গে তাদের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার দক্ষতা বাড়ছে। তারা কম আঘাত করলেও আরও নির্ভুলভাবে করছে।
এই পরিস্থিতি ইরানকে দুটি বড় সুবিধা দিয়েছে। প্রথমত, তেলের উচ্চমূল্য যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চাপ তৈরি করছে, কিন্তু ইরানের অবস্থানকে শক্তিশালী করছে। এর ফলে ট্রাম্প প্রশাসন বাধ্য হয়ে ইরানি তেলের ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে। দ্বিতীয়ত, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়া ইরানের তুলনায় তার প্রতিবেশীদের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ইরানের তেল রপ্তানি সামান্য কমেছে, কিন্তু প্রতিবেশীদের রপ্তানি অনেক বেশি কমেছে। তেলের দাম বাড়ায় ইরান সম্ভবত এখন আগের চেয়ে বেশি আয় করছে। এমনকি দীর্ঘদিন দুর্বল থাকা মুদ্রাও কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে।
তবে এই কৌশলের মূল্যও রয়েছে। ইরান এখনও ভারী বোমাবর্ষণের শিকার হচ্ছে, যা আবাসিক এলাকা ও জ্বালানি অবকাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কও খারাপ হয়েছে, এবং তাদের মধ্যে অনেকেই এখন ট্রাম্পকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে।
যুদ্ধের শুরুতে ইরানের কৌশল প্রতিপক্ষকে অবাক করলেও সময়ের সঙ্গে সবাই মানিয়ে নেবে। উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প পথ ও পাইপলাইনে বিনিয়োগ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক শক্তিগুলো ভবিষ্যতে প্রণালী বন্ধ হওয়া ঠেকাতে পরিকল্পনা করবে। এসবই ইরানের জন্য দীর্ঘমেয়াদে চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। যুদ্ধ শেষ হলেও দেশটিকে তার অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত সংকট মোকাবিলা করতে হবে, পাশাপাশি বহু নেতার মৃত্যুর প্রভাবও সামলাতে হবে।
ইরান এই যুদ্ধ চায়নি, কিন্তু এটি কীভাবে ব্যবহার করতে হয় তা শিখে ফেলেছে। হরমুজ প্রণালী বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি বড় দুর্বলতা, এবং এটি বন্ধ করার ক্ষমতা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ—তেহরান তা মনে রাখবে। এই প্রভাব তাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো সমাধান করবে না, তবে যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত করে রাখবে, যদিও দীর্ঘদিন ধরে অঞ্চল থেকে সরে আসার কথা বলা হচ্ছিল।
দিনা এসফান্দিয়ারি ও জিয়াদ দাউদ 


















