ইরানে চলমান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বিমান পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দুবাইভিত্তিক এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ এবং এতিহাদ এয়ারওয়েজের মতো শীর্ষ উপসাগরীয় এয়ারলাইনগুলো ব্যাপক ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে। এতে লাখ লাখ যাত্রীর ভ্রমণ পরিকল্পনা ভেঙে পড়েছে এবং আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোভিড মহামারির পর এই যুদ্ধই উপসাগরীয় এয়ারলাইনগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে।
যুদ্ধের কারণে হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিল
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে পরিকল্পিত ফ্লাইটের অর্ধেকেরও বেশি বাতিল হয়ে গেছে। বিমান চলাচল বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান সিরিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৫২ হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
এর ফলে প্রায় ৬০ লাখ যাত্রী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক যাত্রী অন্য দেশে যাওয়ার জন্য এই অঞ্চলের বিমানবন্দরগুলোকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করতেন। ফলে যুদ্ধের কারণে পুরো আন্তর্জাতিক যাত্রা নেটওয়ার্কে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে।
বিমান শিল্প বিশ্লেষক মাইক মালিক বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বিমান সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। কিন্তু এমন সংকট দেখা দিলে সেই পুরো ব্যবস্থাই কার্যত ভেঙে পড়ে।

ভৌগোলিক সুবিধায় গড়ে ওঠা বৈশ্বিক কেন্দ্র
এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ এবং এতিহাদ এয়ারওয়েজের সাফল্যের পেছনে প্রধান ভূমিকা রয়েছে তাদের ভৌগোলিক অবস্থানের।
দুবাই, দোহা ও আবুধাবি পৃথিবীর এমন স্থানে অবস্থিত, যেখান থেকে ইউরোপ, এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে দীর্ঘ দূরত্বের ভ্রমণ সহজে সংযুক্ত করা যায়। যেমন নিউইয়র্ক থেকে নয়াদিল্লি বা লন্ডন থেকে সিডনি যাওয়ার পথে এই শহরগুলো স্বাভাবিকভাবেই বড় ট্রানজিট কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।
এ ছাড়া এসব এয়ারলাইন নিজেদের সরকারের আর্থিক সহায়তা এবং বিশ্বজুড়ে দক্ষ ব্যবস্থাপকদের নিয়োগ দিয়ে দ্রুত শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে।
বর্তমানে ইউরোপ থেকে এশিয়ায় যাতায়াতকারী প্রতি তিনজনের একজন এবং ইউরোপ থেকে অস্ট্রেলিয়া বা দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যাওয়া প্রতি দুইজনের একজন যাত্রী এই উপসাগরীয় এয়ারলাইনগুলো ব্যবহার করেন।
আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ২২ কোটি ৭০ লাখ যাত্রী এই অঞ্চল দিয়ে যাতায়াত করেছেন।

পর্যটন খাতে বড় ধাক্কা
যুদ্ধের কারণে শুধু বিমান চলাচল নয়, পর্যটন শিল্পও কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
বিমান, ক্রু ও অন্যান্য অপারেশনাল কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় এয়ারলাইনগুলোর খরচ বেড়েছে। অথচ আয়ের উৎস অনেকটাই বন্ধ হয়ে গেছে।
বিমান শিল্প পরামর্শক জন স্ট্রিকল্যান্ড বলেন, বিমান, কর্মী, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশাসনিক খরচ সবই আগের মতো চলছে, কিন্তু ফ্লাইট বন্ধ থাকায় আয় কমে যাচ্ছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ট্যুরিজম ইকোনমিকসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এ বছর পর্যটন খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৩৪ বিলিয়ন থেকে ৫৬ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় ক্ষতির পরিমাণ এই সীমার উপরের দিকেই থাকতে পারে।

বিশ্বজুড়ে ভ্রমণ নেটওয়ার্কে প্রভাব
এই সংকট শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার মতো অনেক দেশ উপসাগরীয় ট্রানজিট রুটের ওপর নির্ভরশীল।
বিমান শিল্প বিশ্লেষক ব্রেনডান সোবে বলেন, বিশ্বজুড়ে শত শত গন্তব্য এই পরিস্থিতির কারণে বিভিন্ন মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
যাত্রীদের দুর্ভোগ
যুদ্ধের কারণে অনেক যাত্রী বিদেশে আটকে পড়েছেন। একটি আন্তর্জাতিক মানবসম্পদ কোম্পানি তাদের প্রায় ১৫০০ কর্মীকে দুবাইয়ে একটি করপোরেট অনুষ্ঠানে এনেছিল। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালায় এবং প্রায় ৫০০ কর্মী আটকে পড়েন।
কোম্পানিটি পরে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে প্রায় ১০০ কর্মীকে বাসে করে ওমান পাঠায়, সেখান থেকে তারা অন্য দেশে উড়ে যান। এক সপ্তাহের মধ্যে অধিকাংশ কর্মীকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়।
তবে অনেক যাত্রী অভিযোগ করেছেন যে, বিমান সংস্থা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে তারা পরিষ্কার তথ্য বা পর্যাপ্ত সহায়তা পাননি।
এয়ারলাইনগুলোর সুনামের বড় পরীক্ষা
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি উপসাগরীয় এয়ারলাইনগুলোর জন্য বড় সুনামগত পরীক্ষাও বটে।
এই তিনটি বড় এয়ারলাইন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য মুনাফা করেছে এবং ভালো সেবার জন্য পরিচিতি অর্জন করেছে।
১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এমিরেটস শুরুতে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় যাত্রা শুরু করেছিল। তখন দুবাই আজকের মতো বড় অর্থনৈতিক কেন্দ্র হয়ে ওঠেনি। কিন্তু চার দশকে এই এয়ারলাইন বিশ্ব বিমান শিল্পে অন্যতম শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে উপসাগরীয় এয়ারলাইনগুলোর লাভের হার বিশ্বে সবচেয়ে বেশি। আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, গত বছর এই অঞ্চলের এয়ারলাইনগুলো প্রতি যাত্রী থেকে গড়ে ২৯ ডলার লাভ করেছে। তুলনায় ইউরোপে তা প্রায় ১১ ডলার এবং উত্তর আমেরিকায় প্রায় ১০ ডলার।

সংকট কাটলে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর আশা
বিমান শিল্প বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করেন, যুদ্ধের ঝুঁকি কমে গেলে উপসাগরীয় এয়ারলাইনগুলো দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।
অতীতে বিমান দুর্ঘটনা, সন্ত্রাসী হামলা কিংবা কোভিড মহামারির মতো বড় সংকটের পরও বিমান ভ্রমণ দ্রুত স্বাভাবিক হয়েছে।
বড় এয়ারলাইনগুলোর শক্তিশালী নগদ সঞ্চয়ও তাদের পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে। তবে ছোট ও স্বল্পমূল্যের এয়ারলাইনগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।
অন্য এয়ারলাইনগুলোর সুযোগ
এই পরিস্থিতিতে ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলের কিছু এয়ারলাইন সাময়িকভাবে লাভবান হতে পারে।
ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, লুফথানসা, কোয়ান্টাস এবং তুর্কিশ এয়ারলাইনসের মতো সংস্থাগুলোর দীর্ঘ দূরত্বের ফ্লাইটগুলো এখন প্রায় পূর্ণ যাত্রী নিয়ে উড়ছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
লুফথানসা ইতোমধ্যে এশিয়া ও আফ্রিকার কিছু গন্তব্যে অতিরিক্ত ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
তবে নতুন রুট চালু করা সহজ নয়। কারণ বেশিরভাগ এয়ারলাইনের কাছে অতিরিক্ত বিমান, পাইলট বা কেবিন ক্রু খুব বেশি থাকে না।
তবুও অনেক প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতে আবারও দুবাইয়ের মতো শহরে বড় আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে না। কারণ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কর্মীদের একত্র করার জন্য এই শহর এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















