অধিকৃত পশ্চিম তীরে এক মর্মান্তিক ঘটনায় একটি ফিলিস্তিনি পরিবারের চার সদস্য নিহত হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা রাতের বেলায় গাড়িতে করে ঘুরতে বেরিয়েছিলেন। কিন্তু বাড়ি ফেরার আগেই ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারান বাবা, মা এবং দুই শিশু সন্তান। ঘটনাটি নিয়ে ইসরায়েলি বাহিনী ও পরিবারের বেঁচে যাওয়া শিশুদের বর্ণনায় বড় ধরনের বিরোধ দেখা গেছে।

রোজার শেষ দিনগুলোর পারিবারিক মুহূর্ত
৩৭ বছর বয়সী আলি বানি ওদেহ প্রায় দেড় মাস পর বাড়ি ফিরেছিলেন। তিনি ইসরায়েলে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন এবং রমজানের শেষ কয়েক দিন পরিবারের সঙ্গে কাটানোর জন্য পশ্চিম তীরের তাম্মুন শহরে নিজের বাড়িতে আসেন।
শনিবার রাতে তার চার ছেলে তাকে বাইরে নিয়ে যাওয়ার জন্য জোর করে। সামনে ঈদুল ফিতর, তাই নতুন কাপড় কেনা এবং মিষ্টি খাওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
তারা প্রথমে টুবাস শহরে গিয়ে ভাজা ডোনাট কিনে রাখে। পরে নাবলুসে একটি কাপড়ের দোকানে যায়, কিন্তু দোকানটি তখন বন্ধ ছিল। রাত অনেক হয়ে যাওয়ায় তারা বাড়ির দিকে ফিরতে শুরু করে।
গাড়িতে ছিল ছয়জন
গাড়িতে ছিলেন আলি বানি ওদেহ, তার স্ত্রী ওয়াদ (৩৫) এবং তাদের চার ছেলে।
পেছনের সিটে বসেছিল ১১ বছরের খালেদ, ৮ বছরের মুস্তাফা এবং ৫ বছরের মুহাম্মদ। সামনে মায়ের কোলে ছিল ৬ বছরের ওসমান। ওসমান জন্মগতভাবে দৃষ্টিহীন ছিল এবং নিজে হাঁটতে বা খেতে পারত না।
বাড়ির কাছেই ঘটে গুলির ঘটনা
বাড়ি থেকে মাত্র কয়েক মিনিট দূরে একটি মোড় ঘোরার সময় ওয়াদ তার স্বামীকে গাড়ি থামাতে বলেন। তিনি ব্যাগ থেকে কিছু বের করতে চাইছিলেন এবং ওসমানকে বাবার কাছে দিতে চেয়েছিলেন।
ঠিক তখনই শিশুদের ভাষ্য অনুযায়ী চারদিক থেকে লেজার লাইট তাদের গাড়ির ওপর পড়তে থাকে। তাদের মা চিৎকার করেন। বাবা “আল্লাহ মহান” বলে উঠেন। এরপরই শুরু হয় তীব্র গুলিবর্ষণ।
গুলিতে নিহত হন আলি বানি ওদেহ, তার স্ত্রী ওয়াদ, ছেলে ওসমান এবং ছোট ছেলে মুহাম্মদ।

ইসরায়েলি বাহিনীর বক্তব্য
রবিবার সকালে ইসরায়েলি পুলিশ ও সামরিক বাহিনী যৌথ বিবৃতিতে জানায়, তাম্মুন এলাকায় সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের অভিযানে থাকা সীমান্ত পুলিশ ও সেনারা একটি গাড়িকে তাদের দিকে দ্রুতগতিতে আসতে দেখে বিপদের আশঙ্কা করে গুলি চালায়।
তাদের দাবি, পরিস্থিতি তদন্ত করা হচ্ছে।
তবে বেঁচে যাওয়া শিশুদের বর্ণনা এবং এই সরকারি বক্তব্যের মধ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে।
![]()
পশ্চিম তীরে বাড়ছে সহিংসতা
ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণাধীন পশ্চিম তীরে সাম্প্রতিক সময়ে উত্তেজনা বেড়েছে। বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং সামরিক অভিযান নিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছে।
চলতি বছরে এখন পর্যন্ত সাতজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে, যার বেশিরভাগ ঘটনাই ঘটেছে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বলছে তারা বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা প্রতিরোধের চেষ্টা করছে। তবে সমালোচকদের মতে, এসব ঘটনায় দোষীদের বিচার খুব কমই হয়।

তাম্মুনে অভিযানের উদ্দেশ্য
ফিলিস্তিনি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, ঘটনার পর ইসরায়েলি পক্ষ তাদের জানায় যে তাম্মুনে অভিযানের লক্ষ্য ছিল দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করা। একজনের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক তৈরির সন্দেহ এবং অন্যজনের বিরুদ্ধে সামাজিক মাধ্যমে সহিংসতা উসকে দেওয়ার অভিযোগ ছিল।
তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা শুধু বিস্ফোরক তৈরির সন্দেহভাজনদের কথাই উল্লেখ করেছেন।
বেঁচে যাওয়া দুই শিশুর বর্ণনা
গুলির ঘটনায় বেঁচে যায় দুই ভাই—১১ বছরের খালেদ এবং ৮ বছরের মুস্তাফা। মুস্তাফার নাকে গুলির টুকরো লেগে আঘাত পেয়েছে।
মুস্তাফা জানায়, সে তার ছোট ভাই মুহাম্মদকে টেনে নিজের কাছে আনার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তখনই সে বুঝতে পারে ভাইটি মারা গেছে।
খালেদ জানায়, গুলি থামার পর সে গাড়ির দরজা খুলে সাহায্যের জন্য চিৎকার করেছিল। তার দাবি, সৈন্যরা তাকে চুপ থাকতে বলে এবং একজন তার চুল ধরে গাড়ি থেকে টেনে বের করে। পরে তাকে মাটিতে ফেলে পায়ে চাপা দেয় এবং জিজ্ঞাসাবাদ করে।
তার কথায়, এক আরবি ভাষাভাষী সৈন্য তাকে ‘হাবিবি’ বলে ডাকলেও পরে লাথি মারতে থাকে।
যখন তারা টয়লেটে যাওয়ার কথা বলে, সৈন্যরা তাদের প্রায় ১০০ মিটার দূরে থাকা একটি ফিলিস্তিনি অ্যাম্বুলেন্সের দিকে যেতে বলে।

গাড়ির ভেতরের দৃশ্য
অ্যাম্বুলেন্সের দিকে হাঁটার সময় খালেদ বলে, এক সৈন্য গাড়ির দরজা খুলে দেয়। তখন সে গাড়ির ভেতরে তার বাবা-মায়ের নিথর দেহ দেখতে পায়।
পরিবারের দাদার বর্ণনা অনুযায়ী, হাসপাতালে তিনি নিহতদের দেহ দেখেছেন। তার পুত্রবধূর মাথা ও বুকে একাধিক গুলি ছিল। ছোট মুহাম্মদের মুখেও একাধিক গুলির আঘাত ছিল।
শেষ স্মৃতি
১১ বছরের খালেদ স্তব্ধ কণ্ঠে জানায়, গুলির আগে তারা নাবলুসে ঘুরছিল, ডোনাট কিনেছিল এবং আনন্দ করছিল।
তার ভাষায়, “এক বা দুই ঘণ্টা আগেও আমরা শহরে ঘুরছিলাম। তারা আমাদের অনেক জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল। আমাদের জন্য ডোনাট কিনেছিল। তারপর আমরা বাড়ি ফিরছিলাম।”
ডোনাটগুলো শেষ পর্যন্ত ব্যাগেই রয়ে যায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















