মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, চীন যদি হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে সহযোগিতা না করে, তাহলে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে নির্ধারিত শীর্ষ বৈঠক তিনি পিছিয়ে দিতে পারেন। মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই মন্তব্য নতুন কূটনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।
নির্ধারিত সফর ঘিরে অনিশ্চয়তা
হোয়াইট হাউসের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ৩১ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত ট্রাম্পের বেইজিং সফরের কথা রয়েছে। তবে গত মাসের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। এর জবাবে ইরান পাল্টা পদক্ষেপ নেয়, যার ফলে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্বের মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও গ্যাস সরবরাহের জন্য এই জলপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামও বেড়ে গেছে।

চীনের প্রতি ট্রাম্পের আহ্বান
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিনান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, যেসব দেশ হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করে লাভবান হয়, তাদেরও এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখা উচিত।
তিনি বলেন, “চীনও এতে সাহায্য করা উচিত।”
ট্রাম্প উল্লেখ করেন, চীন মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি করে। তাই নির্ধারিত শীর্ষ বৈঠকের আগে তিনি জানতে চান, বেইজিং এই বিষয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে চায়।
তিনি বলেন, বৈঠকের আগে হাতে যে দুই সপ্তাহ সময় আছে তা অনেক দীর্ঘ সময়। পরিস্থিতি পরিষ্কার না হলে বৈঠক পিছিয়ে দেওয়া হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণের আহ্বান
এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প এক বার্তায় চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশকে আহ্বান জানান, তারা যেন হরমুজ অঞ্চলে নিজেদের জাহাজ পাঠায়। তার দাবি, এতে করে জ্বালানি পরিবহনের ওপর কোনো দেশের হুমকি আর কার্যকর থাকবে না।
চীনের প্রতিক্রিয়া
এই আহ্বানের জবাবে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে চীনা বিশ্লেষকদের উদ্ধৃত করে বলা হয়, ওয়াশিংটন মূল সমস্যাকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করছে।
তাদের মতে, হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনার মূল কারণ হচ্ছে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান। তাই আরও দেশকে এতে জড়ানোর চেষ্টা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
প্যারিসে অর্থনৈতিক আলোচনা
ট্রাম্পের এই মন্তব্য প্রকাশিত হয় এমন এক সময়, যখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এবং চীনের উপপ্রধানমন্ত্রী হে লিফেংসহ দুই দেশের অর্থনৈতিক কর্মকর্তারা প্যারিসে বৈঠকে বসেছেন। এই আলোচনা ট্রাম্পের সম্ভাব্য বেইজিং সফরের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দ্বিতীয় মেয়াদে দ্বিতীয় বৈঠক
যদি বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়, তবে এটি হবে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিতীয় সরাসরি বৈঠক। গত বছরের অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত এপেক সম্মেলনের ফাঁকে দুই নেতা বাণিজ্য বিরোধ সাময়িকভাবে কমানোর বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছিলেন।
এরপর যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসনের তথাকথিত ‘পারস্পরিক শুল্ক’ নীতি সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে দেয়। পরে যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে নতুন শুল্ক আরোপ করে এবং অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার অভিযোগে কয়েকটি দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত শুক্রবার জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো একক অধিকার নেই তার বাণিজ্য অংশীদারদের উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার।
তাইওয়ান ইস্যুও আলোচনায়
সম্ভাব্য বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে তাইওয়ান ইস্যুও থাকতে পারে। সম্প্রতি টেলিফোনে ট্রাম্পের সঙ্গে আলাপের সময় শি জিনপিং তাইওয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রি নিয়ে সতর্কতা জানিয়েছেন।

ইরান সংঘাতের প্রভাব
চীনের ঘনিষ্ঠ অংশীদার ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত ট্রাম্প-শি বৈঠকের প্রস্তুতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পরপরই বিশ্লেষকেরা বলেছিলেন, বৈঠক পিছিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও অনেকেই মনে করেছিলেন শেষ পর্যন্ত বৈঠকটি অনুষ্ঠিতই হবে।
সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর জোর
এই মাসে চীনের জাতীয় গণকংগ্রেসে বক্তব্য দিতে গিয়ে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, মুখোমুখি বৈঠক এড়িয়ে গেলে ভুল বোঝাবুঝি ও ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি বাড়বে।
ওয়াং আরও বলেন, ইরানকে ঘিরে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে, তা আদৌ হওয়া উচিত ছিল না।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















