মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে হরমুজ প্রণালি নিরাপদ রাখতে আন্তর্জাতিক নৌজোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেছেন, বহু দেশ ইতোমধ্যে সহযোগিতার বার্তা দিয়েছে এবং সহায়তা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে একই সঙ্গে বেশ কয়েকটি মিত্র দেশ সামরিকভাবে জড়াতে অনীহা প্রকাশ করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
জোট গঠনে ট্রাম্পের দাবি
সোমবার দেওয়া এক বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, বহু দেশ তাকে জানিয়েছে যে তারা হরমুজ প্রণালি সুরক্ষায় এগিয়ে আসছে। কিছু দেশ খুব উৎসাহ দেখালেও কিছু দেশ ততটা আগ্রহী নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি জানান, কোন কোন দেশ এই উদ্যোগে যোগ দিচ্ছে তা এখনই প্রকাশ করতে চান না। পরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে ঘোষণা দেবেন বলেও ইঙ্গিত দেন।
ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনী পৌঁছাতে সময় লাগছে। কারণ অনেক ক্ষেত্রে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে সেখানে যেতে হচ্ছে। তবে স্থানীয় কিছু দেশ ইতোমধ্যে সহযোগিতা শুরু করেছে বলেও তিনি দাবি করেন।
এর আগে তিনি চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন এই জোটে অংশ নিতে। একই সঙ্গে ন্যাটো জোটভুক্ত দেশগুলোকেও এতে যুক্ত হওয়ার অনুরোধ করেন।
তবে এখন পর্যন্ত কোনো দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেনি।
মিত্র দেশগুলোর অনীহা
ট্রাম্পের আহ্বানের বিপরীতে বেশ কয়েকটি দেশ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে তারা হরমুজ প্রণালিতে সামরিক জাহাজ পাঠাবে না।
অস্ট্রেলিয়া, জাপান, পোল্যান্ড, সুইডেন এবং স্পেন ইতোমধ্যে সামরিক অংশগ্রহণের সম্ভাবনা নাকচ করেছে।
জার্মানির প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, তাদের দেশ সরাসরি সামরিক অভিযানে অংশ নেবে না, তবে কূটনৈতিক উদ্যোগে সহায়তা করতে পারে।
যুক্তরাজ্য ও দক্ষিণ কোরিয়া পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানিয়েছে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তারা অঞ্চলে মাইন শনাক্তকারী ড্রোন পাঠানোর সম্ভাবনা বিবেচনা করছে, তবে বৃহত্তর যুদ্ধে জড়ানোর কোনো ইচ্ছা নেই।
ফ্রান্স তুলনামূলকভাবে সহযোগিতার বিষয়ে কিছুটা ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছে।
মিত্রদের এই অনীহা নিয়ে ট্রাম্প অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র যেসব দেশকে নিরাপত্তা দিয়েছে, তাদের কেউ কেউ এখন সহযোগিতায় আগ্রহ দেখাচ্ছে না।

হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা ও তেলের বাজার
ইরানের জাহাজে হামলা এবং পাল্টা উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়েই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে।
বিশ্বের মোট তেল ব্যবহারের প্রায় এক চতুর্থাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে তা সরাসরি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে।
যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি ও মানবিক সংকট
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যাচ্ছে।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরানের শতাধিক নৌযান ধ্বংস হয়েছে এবং হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, এই সংঘাতে বহু বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। একটি মেয়েদের স্কুলে হামলায় বহু শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এ পর্যন্ত ইরানে হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলেও প্রাণহানির খবর রয়েছে। যুদ্ধের কারণে লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়েছে।
যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত তেহরানের
অন্যদিকে ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তারা লড়াই থেকে সরে আসবে না।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, তাদের দেশ নিজেদের রক্ষায় কোনো দ্বিধা করবে না এবং প্রয়োজন হলে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে প্রস্তুত।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান এমন একটি জাতি যারা নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষায় শেষ পর্যন্ত লড়াই করতে প্রস্তুত।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















