মার্কিন কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের পরিচালক কাশ প্যাটেলকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র আকার ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ শুনানিতে তার ব্যক্তিগত আচরণ, অতিরিক্ত মদ্যপানের অভিযোগ, বিদেশ সফর, অভিবাসন নীতি এবং নির্বাচনসংক্রান্ত পদক্ষেপ নিয়ে একের পর এক কঠিন প্রশ্ন তোলেন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা। পুরো শুনানি জুড়ে ছিল উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং রাজনৈতিক চাপানউতোর।
শুনানিতে মূলত বিচার বিভাগের অধীনস্থ বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ২০২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন কাশ প্যাটেল নিজেই। এফবিআইয়ের বর্তমান কার্যক্রম, সংস্থার ভেতরের পরিবেশ এবং প্যাটেলের নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধী দলীয় সিনেটররা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন

মেরিল্যান্ডের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন শুনানির শুরুতেই কাশ প্যাটেলকে লক্ষ্য করে তীব্র ভাষায় বক্তব্য দেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে তার আগ্রহ নেই। কিন্তু যখন ব্যক্তিগত আচরণ একজন সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনে প্রভাব ফেলে, তখন সেটি জনস্বার্থের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে অভিযোগ ওঠে, প্যাটেলের অতিরিক্ত মদ্যপান এবং হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার মতো আচরণ সহকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এমনও দাবি করা হয়েছিল, কিছু সময়ে তাকে এতটাই অসুস্থ অবস্থায় পাওয়া গেছে যে তার কর্মীরা বাড়িতে জোর করে প্রবেশ করতে বাধ্য হন। এসব অভিযোগ সামনে এনে ভ্যান হোলেন বলেন, “আপনি যদি দায়িত্ব পালনের মতো অবস্থায় না থাকেন, তাহলে সেটি শুধু ব্যক্তিগত বিষয় থাকে না।”
তবে কাশ প্যাটেল এসব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে প্রকাশিত তথ্য মিথ্যা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এর আগে তিনি ওই প্রতিবেদন নিয়ে আইনি ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছেন। শুনানিতেও তিনি নিজের অবস্থানে অনড় থাকেন এবং বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।
উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ে থমকে যায় শুনানি
শুনানির একপর্যায়ে পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে দুই পক্ষই একে অপরের কথা কেটে কথা বলতে শুরু করেন। কাশ প্যাটেল পাল্টা অভিযোগ তুলে ভ্যান হোলেনের একটি বৈঠক নিয়ে মন্তব্য করেন এবং দাবি করেন, তিনি একজন দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির সঙ্গে আড্ডা দিয়েছেন। এই মন্তব্যের পর শুনানিকক্ষে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেও পুরোপুরি সফল হননি কমিটির সদস্যরা। ভ্যান হোলেন তখন সরাসরি প্রশ্ন করেন, সামরিক বাহিনীতে ব্যবহৃত মদ্যপান নির্ধারণী পরীক্ষার মতো কোনো পরীক্ষায় অংশ নিতে তিনি রাজি কি না। জবাবে কাশ প্যাটেল বলেন, “আপনি যেকোনো পরীক্ষা নিতে পারেন, আমি প্রস্তুত।” এরপর তিনি আরও বলেন, “চলুন, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে পরীক্ষা দিই।”
এই মন্তব্যের পর শুনানিকক্ষে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে ভ্যান হোলেন তাকে উদ্দেশ করে বলেন, “আপনি কংগ্রেসকে বিভ্রান্ত করছেন।” উত্তরে প্যাটেলও কঠোর ভাষায় জবাব দেন। একপর্যায়ে ভ্যান হোলেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আপনি একটি লজ্জাজনক উদাহরণ।”
ইতালি সফর নিয়ে নতুন প্রশ্ন
কাশ প্যাটেলের সাম্প্রতিক ইতালি সফর নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা হয়। ডেলাওয়ারের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস কুনস জানতে চান, অলিম্পিক চলাকালে তার সফরের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল এবং সেটি সরকারি কাজের সঙ্গে কতটা সম্পর্কিত।
জবাবে প্যাটেল বলেন, সফরটি শুধুমাত্র ক্রীড়া অনুষ্ঠান ঘিরে ছিল না। তার দাবি, ওই সফরের সময় ইতালিতে আটক এক চীনা সাইবার অপরাধীকে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। ওই ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কোভিড-১৯ গবেষণাসংক্রান্ত তথ্য চুরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্যাটেল জানান, ওই ব্যক্তিকে চীনে ফেরত পাঠানোর পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসতে এফবিআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তার ভাষায়, এটি ছিল একটি বড় গোয়েন্দা সাফল্য।

তবে বিরোধী সিনেটররা এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হননি। তাদের অভিযোগ, সফরের সময় প্যাটেলকে উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপন করতে দেখা গেছে, যা একজন গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা কর্মকর্তার আচরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ওয়াশিংটনের ডেমোক্র্যাট সিনেটর প্যাটি মারে কটাক্ষ করে বলেন, “যদি আপনি লকাররুমে উদযাপন আর পানাহার করতে চান, তাহলে সেটি অন্য পেশার জন্য রেখে দিন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজ আরও বেশি দায়িত্বশীল আচরণ দাবি করে।”
অভিবাসন নীতিতে এফবিআইয়ের ভূমিকা
শুনানিতে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতিতে এফবিআইয়ের ভূমিকা নিয়েও বিস্তর আলোচনা হয়। বিশেষ করে সীমান্ত নিরাপত্তা ও অভিবাসন কার্যক্রমে কতজন এফবিআই এজেন্টকে যুক্ত করা হয়েছে, সে বিষয়ে জানতে চান আইনপ্রণেতারা।
কাশ প্যাটেল বলেন, কাউকে স্থায়ীভাবে শুধু অভিবাসন কার্যক্রমে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। তবে তিনি সুনির্দিষ্ট সংখ্যা দিতে পারেননি। এই জবাব নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন কয়েকজন সিনেটর। তাদের অভিযোগ, এফবিআইয়ের মূল তদন্ত কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ

২০২০ সালের মার্কিন নির্বাচনকে ঘিরেও শুনানিতে প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে জর্জিয়ায় শত শত ব্যালট জব্দ এবং নির্বাচনকর্মীদের ব্যক্তিগত তথ্য চাওয়ার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন ডেমোক্র্যাট সদস্যরা। তাদের আশঙ্কা, এসব পদক্ষেপ ভবিষ্যৎ নির্বাচনে নির্বাচনকর্মীদের মধ্যে ভয় এবং অনাস্থা তৈরি করতে পারে।
জবাবে কাশ প্যাটেল বলেন, এসব পদক্ষেপ আদালতের অনুমোদন নিয়েই করা হয়েছে এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। তার দাবি, সম্ভাব্য অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রে এফবিআই আইন মেনেই কাজ করেছে।
চাপ বাড়ছে প্যাটেলের ওপর
সাম্প্রতিক সময়ে কাশ প্যাটেলকে ঘিরে বিতর্ক ক্রমেই রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হয়ে উঠছে। সমালোচকদের অভিযোগ, তার নেতৃত্বে এফবিআই অতিরিক্ত রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে পড়েছে। অন্যদিকে সমর্থকরা বলছেন, তিনি সংস্থাকে আরও সক্রিয় ও আক্রমণাত্মকভাবে পরিচালনা করছেন।
এই শুনানি স্পষ্ট করে দিয়েছে, কাশ প্যাটেলকে ঘিরে বিতর্ক এখন শুধু ব্যক্তিগত আচরণে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নিরপেক্ষতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় আলোচনায় রূপ নিচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















