ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা ধ্বংস করে দেওয়ার দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে সেই দাবি সত্ত্বেও ইরান এখনও নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ছে প্রতিবেশী দেশ ও ইসরায়েলের দিকে। এতে প্রশ্ন উঠেছে—যদি ইরানের সামরিক সক্ষমতা প্রায় ধ্বংস হয়ে থাকে, তাহলে তারা এখনও কীভাবে হামলা চালাচ্ছে?
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি: ইরানের সক্ষমতা ভেঙে দেওয়া হয়েছে
যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের নৌবাহিনীও যুদ্ধের সক্ষমতা হারিয়েছে এবং আকাশপথে প্রায় সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া সামরিক অভিযানের ফলেই এই বড় সাফল্য এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেছেন, ইরানের ড্রোন উৎপাদন সক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে ধ্বংস করা হয়েছে।

তবুও চলছেই হামলা
এসব দাবি সত্ত্বেও বাস্তব চিত্র কিছুটা ভিন্ন। সোমবার কাতার জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র তারা প্রতিহত করেছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনেও সতর্কতা জারি করা হয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে একটি ক্ষেপণাস্ত্র একটি গাড়িতে আঘাত করলে একজন নিহত হন। এতে বোঝা যাচ্ছে, ইরানের হামলা পুরোপুরি থেমে যায়নি।
হামলার সংখ্যা কমেছে
যুদ্ধের শুরুতে ইরান ব্যাপক আকারে হামলা চালালেও এখন সেই সংখ্যা অনেক কমে গেছে। সংঘাতের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে শতাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও শত শত ড্রোন ছুড়েছিল।
কিন্তু যুদ্ধের দুই সপ্তাহ পার হওয়ার পর একই দিনে মাত্র কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপের ঘটনা দেখা গেছে। ইসরায়েলের দিকেও হামলার মাত্রা অনেক কমে এসেছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম দিনের তুলনায় এখন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রায় ৯০ শতাংশ কমেছে এবং ড্রোন হামলা কমেছে প্রায় ৮৬ শতাংশ।
ইরানের বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার ইরানেরই। বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ধারণা করা হয়, ইরানের কাছে কয়েক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে।
যৌথ হামলার বড় লক্ষ্য ছিল ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করা। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শতাধিক উৎক্ষেপণ যন্ত্র অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে।
তবে ইরান একটি বিশাল দেশ হওয়ায় সব উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ধ্বংস করা কঠিন। অনেক ক্ষেপণাস্ত্র আগে থেকেই গোপন স্থানে সরিয়ে রাখা হয়েছিল বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

ইরানের নতুন কৌশল
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এখন বড় আকারের হামলা না চালিয়ে ধীরে ধীরে সীমিত হামলা চালানোর কৌশল নিয়েছে। এতে একসঙ্গে অনেক ক্ষেপণাস্ত্র না ছুড়ে এক বা দুটি করে নিক্ষেপ করা হচ্ছে।
এই কৌশলের লক্ষ্য মূলত প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করা এবং তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সব সময় সতর্ক অবস্থায় রাখতে বাধ্য করা।
ইরান আরও একটি বড় কৌশল ব্যবহার করছে—মোবাইল উৎক্ষেপণ যন্ত্র। এগুলো সহজে স্থান পরিবর্তন করতে পারে, ফলে সেগুলো খুঁজে বের করা কঠিন।
ড্রোন যুদ্ধের বড় অস্ত্র
ইরানের অন্যতম শক্তি তাদের সস্তা কিন্তু কার্যকর ড্রোন। এসব ড্রোন তুলনামূলক সহজ কারখানায় দ্রুত তৈরি করা যায় এবং একসঙ্গে অনেকগুলো পাঠানো সম্ভব।
এগুলো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করে দিতে পারে। ধীরগতির হলেও অনেক সময় এসব ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছে যায়।
অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করার লক্ষ্য
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের কৌশলের বড় অংশ হলো অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো বা জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে এবং বৈশ্বিক বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালীর আশপাশে জাহাজ চলাচলেও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকলেও দীর্ঘস্থায়ী চাপ সৃষ্টি করে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার কৌশলই এখন ইরানের প্রধান লক্ষ্য।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















