প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কর কমানোর আইনে অস্বাভাবিক বড় ট্যাক্স রিফান্ডের মধ্য দিয়ে ২০২৬ সালের শুরুটা মার্কিন অর্থনীতির জন্য জোরালো হওয়ার কথা ছিল। গত ডিসেম্বরে এক প্রাইম-টাইম ভাষণে ট্রাম্প নিজেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, আগামী বসন্তে সর্বকালের সবচেয়ে বড় ট্যাক্স রিফান্ড মৌসুম হবে। কিন্তু ফেব্রুয়ারির শেষে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ সেই হিসাব সম্পূর্ণ উলটে দিয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর পর তেল ও গ্যাসের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। রবিবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের জাতীয় গড় মূল্য দাঁড়িয়েছে গ্যালনপ্রতি ৩.৯৪ ডলারে, যা মাত্র এক মাস আগের তুলনায় এক ডলারের বেশি বৃদ্ধি। স্ট্যানফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিক পলিসি রিসার্চের পরিচালক নিল মাহোনি গোল্ডম্যান স্যাকসের তেলের দাম পূর্বাভাসের ভিত্তিতে হিসাব করে দেখিয়েছেন যে মে মাসে গ্যাসের দাম গ্যালনপ্রতি ৪.৩৬ ডলারে পৌঁছাতে পারে, তারপর বছরের বাকি সময় ধীরে ধীরে কমবে। অর্থনীতিবিদদের মধ্যে গ্যাসের দাম দ্রুত বাড়ে কিন্তু ধীরে কমে, এই প্রবণতা এতটাই প্রতিষ্ঠিত যে একে তারা “রকেট অ্যান্ড ফেদার্স” ঘটনা বলেন।

রিফান্ড আর জ্বালানি খরচ, কে জিতছে?
ট্যাক্স ফাউন্ডেশনের হিসাবে এই বছর গড় পরিবার রিফান্ডে ৭৪৮ ডলার বেশি পাবে। কিন্তু মাহোনির হিসাবে সেই গড় পরিবারকেই গ্যাসে অতিরিক্ত ৭৪০ ডলার খরচ করতে হবে, অর্থাৎ রিফান্ডের প্রায় পুরোটাই জ্বালানিতে শেষ। অক্সফোর্ড ইকোনমিক্সের অর্থনীতিবিদরা হিসাব করে দেখিয়েছেন, সারা বছর গড়ে গ্যালনপ্রতি ৩.৭০ ডলার দামে গ্যাস থাকলে ভোক্তাদের অতিরিক্ত খরচ হবে প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার, যেখানে বর্ধিত ট্যাক্স রিফান্ডের পরিমাণ ৬০ বিলিয়ন ডলার।
আইআরএস-এর তথ্য অনুযায়ী ৬ মার্চ পর্যন্ত গড় রিফান্ড দাঁড়িয়েছে ৩,৬৭৬ ডলার, যা ২০২৫ সালের ৩,৩২৪ ডলারের তুলনায় ৩৫২ ডলার বেশি। তবে জটিল রিটার্ন দাখিল হওয়ার সাথে সাথে গড় রিফান্ড আরও বাড়তে পারে।

নিম্ন ও মধ্যবিত্তে সবচেয়ে বেশি চাপ
এই জ্বালানি মূল্য ধাক্কায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো, কারণ তারা কম রিফান্ড পান অথচ আয়ের বড় অংশ গ্যাসে খরচ করেন। বামপন্থী থিঙ্ক ট্যাঙ্ক গ্রাউন্ডওয়ার্ক কোলাবোরেটিভের নীতি প্রধান ও বাইডেন হোয়াইট হাউসের সাবেক অর্থনীতিবিদ অ্যালেক্স জেকুয়েজ বলেন, এই জ্বালানি ধাক্কা সবচেয়ে বেশি আঘাত করবে তাদের যাদের সামলানোর সক্ষমতা সবচেয়ে কম, আর ট্যাক্স রিফান্ড তাদের বাঁচাতে আসবে বলে মনে হচ্ছে না।
প্যান্থিয়ন ম্যাক্রোইকোনমিক্সের হিসাবে সবচেয়ে কম আয়ের ১০ শতাংশ মানুষ তাদের আয়ের প্রায় ৪ শতাংশ গ্যাসে খরচ করেন, যেখানে সবচেয়ে বেশি আয়ের ১০ শতাংশ খরচ করেন মাত্র দেড় শতাংশ। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি মার্কিন অর্থনীতির কে-আকৃতির বিভাজনকে আরও তীব্র করবে, যেখানে উচ্চ আয়ের পরিবারগুলো তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকবে।
২০২২-এর তুলনায় এবার অবস্থা আরও নাজুক
এই জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি এমন সময়ে আসছে যখন অনেক মার্কিন ভোক্তা ইতোমধ্যে নাজুক অবস্থায় রয়েছেন। ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের সময়ও গ্যাসের দাম বেড়েছিল, কিন্তু তখন অনেক পরিবারের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মহামারীকালীন প্রণোদনার অর্থ ছিল এবং কোম্পানিগুলো দ্রুত নিয়োগ দিচ্ছিল ও বেতন বাড়াচ্ছিল।
এখন নিয়োগ প্রায় স্থবির এবং গত কয়েক বছরে মার্কিনিদের সঞ্চয়ের হার ক্রমাগত কমেছে, অনেক পরিবার খরচ চালাতে আরও বেশি ঋণ নিচ্ছে। দ্য সেঞ্চুরি ফাউন্ডেশনের সভাপতি জুলি মার্গেটা মরগান বলেন, ভোক্তারা ক্রেডিট কার্ড সীমায় পৌঁছে গেছেন, মুদি কিনতে “বাই নাও, পে লেটার” ব্যবহার করছেন, এখনকার মতো চলছে কিন্তু পরিস্থিতি খুব দ্রুত ভেঙে পড়তে পারে।
তবে বেশিরভাগ বিশ্লেষক এখনও মনে করেন মার্কিন অর্থনীতি এই বছর প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে, যদিও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির কারণে তা ধীরগতির হবে। মহামারীর পর থেকে মার্কিন ভোক্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বারবার ধাক্কা সামলে নিয়ে খরচ অব্যাহত রেখেছে, মন্দার আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















