স্বামী বেঁচে আছেন কি না জানা নেই, ঘরে নেই ঈদের আনন্দ—টেকনাফের উপকূলজুড়ে এখন এমনই এক হৃদয়বিদারক বাস্তবতা। সীমান্তের ওপার থেকে সশস্ত্র গোষ্ঠীর অপহরণ, গুলিবর্ষণ ও সংঘাতের কারণে শতাধিক জেলে এখনো নিখোঁজ বা আটকে রয়েছেন। ফলে হাজার হাজার পরিবার চরম অনিশ্চয়তা আর দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
নিখোঁজ স্বামী, থমকে থাকা সংসার
শাহপরীর দ্বীপের জালিয়াপাড়ায় গেলে দেখা যায়, ভাঙাচোরা টিনের ঘর আর নিস্তব্ধতা। শিশু কোলে নিয়ে বসে থাকা নারীদের চোখে শুধু অপেক্ষা আর কান্না। বহু নারী জানেন না তাঁদের স্বামীরা জীবিত না মৃত। কোনো যোগাযোগ নেই, কোনো খবর নেই। ঈদের দিনেও রান্না হয়নি, নতুন কাপড় কেনা তো দূরের কথা, অনেকের দুই বেলা খাবার জোটানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
একজন গৃহবধূ জানান, স্বামীর আয়েই সংসার চলত। এখন তিনি কোথায়, বেঁচে আছেন কি না—কিছুই জানা নেই। এই অনিশ্চয়তায় ঈদের আনন্দ তো দূরে থাক, স্বাভাবিক জীবনই থেমে গেছে।
অপহরণ আর ভয়ের ছায়া
নাফ নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে একের পর এক জেলে অপহরণের শিকার হচ্ছেন। একই পাড়ার একাধিক জেলে কয়েক দফায় ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কারও এক মাস, কারও দেড় মাস ধরে কোনো খোঁজ নেই। পরিবারগুলো শুধু অপেক্ষা করছে, কোনো একদিন হয়তো ফিরে আসবেন প্রিয়জন।
স্থানীয়দের মতে, গত দেড় বছরে কয়েক শতাধিক জেলেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অনেককে ফিরিয়ে আনা গেলেও এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জেলে মিয়ানমারের বিভিন্ন এলাকায় আটক রয়েছেন।
যুদ্ধের প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে
নাফ নদীর ওপারে সংঘাতের আগুন জ্বলছে, যার প্রভাব পড়ছে এপারের জীবনেও। প্রায়ই শোনা যায় গুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ। কখনো কখনো গুলিও এসে পড়ছে এপারে। এতে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণেও আহত হয়েছেন জেলেরা।
এই পরিস্থিতিতে নদীতে মাছ ধরা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। নৌকাগুলো ঘাটে পড়ে আছে, নদী হয়ে উঠেছে জনশূন্য। ফলে পুরো এলাকার অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে।
জীবিকার সংকটে হাজারো পরিবার
শাহপরীর দ্বীপের অধিকাংশ মানুষই মৎস্যজীবী। কিন্তু ভয় ও অনিশ্চয়তার কারণে মাছ ধরা বন্ধ থাকায় অন্তত ত্রিশ হাজার জেলে পরিবার জীবিকা হারিয়েছে। অনেক পরিবার মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। ঈদের মতো উৎসবও তাদের কাছে কেবল দুঃখের স্মৃতি হয়ে থাকছে।
ফেরানোর চেষ্টা, তবু অনিশ্চয়তা
সীমান্তরক্ষী বাহিনী অপহৃত জেলেদের ফেরাতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে কয়েক দফায় অনেককে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। তবে এখনো বহু জেলে আটকে থাকায় পরিবারের উৎকণ্ঠা কাটছে না।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সীমান্তে শান্তি ফিরুক, নিরাপদে নদীতে নামতে পারুক জেলেরা, আর পরিবারগুলো ফিরে পাক তাদের হারানো স্বাভাবিক জীবন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

























