ইরান যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক নতুন করে আন্তর্জাতিক রাজনীতির উত্তাপ বাড়িয়েছে। ভারত সতর্ক করে বলেছে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা এখন “গুরুত্বপূর্ণ অস্থিরতার” মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে সংঘাত, জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক চাপ একসঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিচ্ছে।
দুই দিনের এই বৈঠকে অংশ নেয় সম্প্রসারিত ব্রিকস জোটের সদস্যরা। নতুন সদস্য হিসেবে ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও উপস্থিত রয়েছে। তবে ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সদস্য দেশগুলোর অবস্থানে স্পষ্ট বিভাজনও সামনে এসেছে।
যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকটে বাড়ছে উদ্বেগ
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেন, চলমান সংঘাত, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং প্রযুক্তি ও বাণিজ্যসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ বিশ্ব পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। একই সঙ্গে খাদ্য, সার, জ্বালানি ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিয়েও বহু দেশ সংকটে রয়েছে।

বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলের নৌপথ ও হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার কারণে তেল ও গ্যাসের বাজারে অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে ভারতসহ জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর ওপর।
ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল আমদানিকারক দেশ। দেশটির মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় অর্ধেকই সাধারণত হরমুজ প্রণালি হয়ে আসে। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ওই রুটে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় ভারত বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকছে।
রাশিয়ার তেলের ওপর আবার নির্ভরতা
সংকট সামাল দিতে ভারত আবারও রাশিয়ার তেলের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও শুল্কনীতির কারণে রাশিয়া থেকে দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে নয়াদিল্লি পুরোনো সহযোগিতার পথেই ফিরছে।
বৈঠকের আগে জয়শঙ্কর রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি ও যোগাযোগ খাত নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

জয়শঙ্কর বলেন, অস্থির বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ভারত-রাশিয়ার রাজনৈতিক সহযোগিতা এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইরানের বার্তা
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বৈঠকে বলেন, হরমুজ প্রণালি সব বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য খোলা রয়েছে, যদি তারা ইরানের নৌবাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করে।
তিনি আরও বলেন, ইরানকে ঘিরে কোনো সমস্যার সামরিক সমাধান নেই। ইরান কখনও চাপ বা হুমকির কাছে নতি স্বীকার করবে না, তবে সম্মানের ভাষার জবাব সম্মান দিয়েই দেবে।
এর মধ্যেই ওমান উপকূলে ভারতীয় পতাকাবাহী একটি জাহাজে হামলার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভারত। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সব নাবিক নিরাপদে উদ্ধার হলেও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা “গ্রহণযোগ্য নয়”।

বিভক্ত ব্রিকস, অনিশ্চিত যৌথ বিবৃতি
২০০৯ সালে পশ্চিমা প্রভাবাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিকল্প শক্তি হিসেবে গড়ে ওঠে ব্রিকস। শুরুতে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা থাকলেও পরে এতে যোগ দেয় মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও পশ্চিমা দেশগুলোকে ঘিরে অবস্থানগত পার্থক্যের কারণে এবার জোটের ভেতরের বিভাজন স্পষ্ট হয়েছে। ফলে বৈঠক শেষে যৌথ ঘোষণা দেওয়া হবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবার বৈঠকে অংশ নেননি। একই সময়ে বেইজিং সফরে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ভারত চলতি বছরের শেষ দিকে ব্রিকস নেতাদের শীর্ষ সম্মেলনেরও আয়োজন করবে। সেখানে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক ও বৈশ্বিক কৌশল নিয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















