পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতির নতুন মোড়ে কাতারের রাস লাফান শিল্পনগরীতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। বিশ্বের বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই স্থাপনায় হামলার প্রভাব শুধু বৈশ্বিক সরবরাহেই নয়, বরং ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তাতেও গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সংঘাতের বিস্তার ও জ্বালানি বাজারে ধাক্কা
ইরান ও কাতারের যৌথ গ্যাসক্ষেত্র সাউথ পার্সে হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান পাল্টা আঘাত হানে কাতারের রাস লাফান স্থাপনায়। একইসঙ্গে সৌদি আরব ও কুয়েতের জ্বালানি অবকাঠামোও লক্ষ্যবস্তু হয়। এতে সংঘাতের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা আরও জোরালো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে এর তাৎক্ষণিক প্রভাব দেখা গেছে। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম হঠাৎ করেই বেড়ে ১১৯ ডলার ছাড়িয়ে যায়, পরে কিছুটা কমে এলেও যুদ্ধের আগের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি অবস্থানে রয়েছে। প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও দ্রুত বেড়েছে।

রাস লাফানের গুরুত্ব কেন এত বেশি
কাতারের রাস লাফান শিল্পনগরী বৈশ্বিক তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের কেন্দ্র। এখানেই কাতার এনার্জির প্রধান উৎপাদন, তরলীকরণ ও রপ্তানি অবকাঠামো অবস্থিত।
সাম্প্রতিক হামলায় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কথা জানানো হয়েছে। যদিও প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি, তবে উৎপাদন স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ভারতের জ্বালানি নির্ভরতা ও ঝুঁকি
ভারতের জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। দেশটির মোট প্রাকৃতিক গ্যাস চাহিদার প্রায় অর্ধেকই আমদানিনির্ভর, যার বড় অংশ আসে কাতার থেকে। কাতার থেকেই ভারতের প্রায় ৪১ শতাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি হয়, যার অধিকাংশই রাস লাফান থেকে সরবরাহ করা হয়।
হরমুজ প্রণালীর কার্যত অচলাবস্থা এবং কাতারের উৎপাদন বন্ধ থাকায় ইতোমধ্যে ভারতে কিছু শিল্পে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে রান্নার গ্যাস সরবরাহেও সংকট দেখা দিয়েছে।

সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা আরও বাড়ছে
এ পর্যন্ত সংঘাতের কারণে মূলত পরিবহন পথেই সমস্যা দেখা দিয়েছিল। হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বহু ট্যাংকার আটকে আছে। তবে এখন উৎপাদন অবকাঠামো সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।
ভারত তার মোট অপরিশোধিত তেলের ৮৮ শতাংশের বেশি, রান্নার গ্যাসের প্রায় ৬০ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের অর্ধেক আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে। এর বড় অংশই পশ্চিম এশিয়া থেকে আসে, যা এই অঞ্চলের অস্থিরতাকে ভারতের জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সতর্ক বার্তা
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তারা আগাম হামলার বিষয়ে কিছু জানত না এবং কাতারও এতে জড়িত নয়। তবে একইসঙ্গে ইরানকে কঠোর হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে, কাতারের জ্বালানি স্থাপনায় আরও হামলা হলে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া জানানো হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। সংঘাত আরও তীব্র হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















