ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি বাজারকে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া, কাতারের রপ্তানি অবকাঠামোর ক্ষতি এবং নতুন সরবরাহ প্রকল্পে সম্ভাব্য বিলম্ব—সব মিলিয়ে আগে যে চাহিদা বৃদ্ধির আশা করা হয়েছিল, তা এখন প্রশ্নের মুখে।
সরবরাহ পূর্বাভাসে বড় কাটছাঁট
যুদ্ধের আগে বিশ্লেষকেরা ধারণা করেছিলেন, নতুন উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত হওয়ায় এ বছর বিশ্বে এলএনজি সরবরাহ প্রায় ১০ শতাংশ বাড়বে এবং মোট পরিমাণ দাঁড়াবে ৪৬০ থেকে ৪৮৪ মিলিয়ন টনে। একইসঙ্গে চাহিদাও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছিল।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ায়, যা দিয়ে বিশ্ব এলএনজি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ চলাচল করে, বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি কাতারের এলএনজি স্থাপনায় ক্ষতির কারণে বছরে ১২.৮ মিলিয়ন টন উৎপাদন আগামী তিন থেকে পাঁচ বছর বন্ধ থাকতে পারে।
এ কারণে বিভিন্ন জ্বালানি পরামর্শক সংস্থা বৈশ্বিক সরবরাহ পূর্বাভাস থেকে প্রায় ৩৫ মিলিয়ন টন কমিয়ে দিয়েছে। এই পরিমাণ এলএনজি প্রায় ৫০০ কার্গোর সমান, যা জাপানের এক বছরের আমদানির অর্ধেকেরও বেশি কিংবা বাংলাদেশের প্রায় পাঁচ বছরের চাহিদা পূরণ করতে পারে।

দাম বাড়ায় চাহিদা কমার আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, এই গ্যাস মূল্য সংকট অনেক দেশকে তাদের গ্যাস ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনায় বাধ্য করবে। ফলে যুদ্ধের আগের তুলনায় এলএনজির চাহিদা বৃদ্ধির হার কমে যেতে পারে।
একইসঙ্গে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে রপ্তানি এ বছর প্রায় ৩৩ মিলিয়ন টন কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া কাতারের নর্থ ফিল্ড সম্প্রসারণ ও অন্যান্য প্রকল্পে বিলম্বের কারণে ২০২৭ থেকে ২০২৯ পর্যন্ত প্রতি বছর আরও ১৯ মিলিয়ন টন সরবরাহ কমে যেতে পারে।
এশিয়ায় এলএনজির দাম ঊর্ধ্বমুখী
সরবরাহ সংকটের কারণে এশিয়ায় এলএনজির দাম ১৪৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বর্তমানে দাম প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে ২৫.৩০ ডলারে পৌঁছেছে, যা তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলো সাধারণত ১০ ডলারের নিচে দাম হলে বেশি এলএনজি কেনে। কিন্তু বর্তমান দাম সেই সীমার অনেক ওপরে, এবং ২০২৭ সাল পর্যন্ত দাম উচ্চ পর্যায়েই থাকতে পারে।

শিল্প খাতে চাহিদা কমছে
কাতারের প্রায় ৮০ শতাংশ এলএনজি এশিয়ায় যায়। কিন্তু বাংলাদেশ ও ভারতের মতো মূল্য-সংবেদনশীল দেশগুলো বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে, যেমন কয়লা বা স্থানীয় গ্যাস।
পাকিস্তান, যা কাতারের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল, বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সপ্তাহে চার দিন কাজ চালু করেছে। সার ও টেক্সটাইলের মতো জ্বালানি-নির্ভর শিল্পে উৎপাদন কমে গেছে।
ভারতেও পেট্রোকেমিক্যাল ও সিরামিক শিল্পে একই ধরনের প্রভাব দেখা যাচ্ছে।
সরবরাহ ঘাটতি পূরণ কঠিন
বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলএনজি রপ্তানিকারক যুক্তরাষ্ট্রও এই ঘাটতি পূরণ করতে পারছে না। তাদের উৎপাদন প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে এবং বেশিরভাগ সরবরাহ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘাটতি সহজে পূরণ করা সম্ভব নয় এবং এতে জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে, বিশেষ করে যেসব দেশ এই সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল।
চীনের কৌশলগত পরিবর্তন
এশিয়ার সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন ইতিমধ্যেই এলএনজির ওপর নির্ভরতা কমানোর পথে হাঁটছে। দেশটি নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন বাড়িয়েছে, রাশিয়া থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আমদানি বাড়িয়েছে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করেছে।
চীনের এক রাষ্ট্রীয় গ্যাস ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, এই বিকল্প উৎসগুলো কাতার থেকে আসা সরবরাহের ঘাটতি সহজেই পূরণ করতে পারবে।

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার অবস্থান
অন্যদিকে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো, যেখানে স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন কম এবং পাইপলাইনের সুযোগ সীমিত, তারা তাদের এলএনজি আমদানি নীতিতে বড় পরিবর্তন আনছে না।
জাপানের বৃহত্তম ক্রেতা জেরা জানিয়েছে, কাতার এখনও নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী এবং তাদের চুক্তি নীতিতে পরিবর্তন আসবে না।
ভবিষ্যৎ জ্বালানি নীতিতে প্রভাব
এই সংকট এশিয়ার দেশগুলোকে বিকল্প জ্বালানির দিকে আরও বেশি ঝুঁকতে বাধ্য করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে এলএনজির চাহিদা স্থায়ীভাবে কমে যেতে পারে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















