তিনটি চ্যানেলে আসছে অর্থনৈতিক ধাক্কা
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান মার্কিন-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গভীর ক্ষত ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং বা সানেম। প্রতিষ্ঠানটির নতুন বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আগামী দুই বছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি তিন শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সেলিম রাইহান। তিনি বলেছেন, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি, বাণিজ্য বিঘ্নিত হওয়া এবং রেমিট্যান্স কমে যাওয়া এই তিনটি চাপ একসঙ্গে কাজ করলে অর্থনীতির সরবরাহ ও চাহিদা দুই দিক থেকেই ধাক্কা আসবে। বৈশ্বিক বাণিজ্য বিশ্লেষণ প্রকল্পের জিটিএপি মডেল ব্যবহার করে তিনটি আলাদা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে এই অনুমান পাওয়া গেছে। সবচেয়ে গুরুতর পরিস্থিতিতে, যেখানে একসঙ্গে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি, রেমিট্যান্স ১০ শতাংশ হ্রাস এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য বিঘ্ন ধরা হয়েছে, সেখানে জিডিপি সংকোচন তিন শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
গবেষণায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় থাকা খাতগুলোর মধ্যে পরিবহন ও লজিস্টিক্স সবার শীর্ষে, যেখানে পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত উৎপাদন সংকোচন হতে পারে। এরপর জ্বালানি-নিবিড় শিল্প খাত চার শতাংশ, তৈরি পোশাক বা আরএমজি খাত সাড়ে চার শতাংশ এবং কৃষি খাত দেড় শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। আরএমজি খাত বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮৪ শতাংশ নিশ্চিত করে এবং এই খাতে কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ ও লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। পরিবহন খাতের ক্ষতি সরাসরি নিত্যপণ্যের দাম বাড়াবে কারণ সড়কপথ ও নৌপথে পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়লে সেটি ভোক্তার ঘরে পৌঁছানোর আগেই পণ্যের দাম চড়িয়ে দেয়।
রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রায় ঝুঁকি
বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি অপরিহার্য স্তম্ভ হলো প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে প্রবাসীরা প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। তবে এই আয়ের বিশাল একটি অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল বা জিসিসি দেশগুলো থেকে মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৪৫ শতাংশ আসে। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক কার্যক্রম বিঘ্নিত হলে রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধাক্কা আসতে পারে। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রেয়াজ বলেছেন, দুটি ঝুঁকি রয়েছে। প্রথমত, যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থান ও মজুরি হুমকিতে পড়বে। দ্বিতীয়ত, পেমেন্ট সিস্টেম বিঘ্নিত হলে অর্থ স্থানান্তরে সমস্যা দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ এখন প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার, তবে বাড়তি জ্বালানি আমদানির খরচ এই মজুদে ক্রমশ চাপ ফেলছে। বাংলাদেশের বাইরের ঋণ প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা বৈশ্বিক সুদহার ও মুদ্রার ওঠানামায় দেশকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশিষ্ট ফেলো মুস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, সরকারকে এখনই একটি জরুরি পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে এবং পাইপলাইনে থাকা বৈদেশিক অর্থায়ন দ্রুত টেনে আনতে হবে যাতে রিজার্ভের চাপ সীমিত থাকে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















