কুড়িগ্রামে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ব্রহ্মপুত্র নদ আরও ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। দীর্ঘদিনের নদীভাঙন এখন আরও তীব্র হয়ে হাজার হাজার মানুষকে গৃহহীন করছে, বিস্তীর্ণ জমি গিলে নিচ্ছে এবং মানুষের জীবনে তৈরি করছে স্থায়ী অনিশ্চয়তা।
ভাঙনে বদলে যাচ্ছে জেলার মানচিত্র
ভারতের আসাম থেকে উৎপত্তি হওয়া ব্রহ্মপুত্র নদ নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়ন দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে কুড়িগ্রাম সদর, উলিপুর, চিলমারি, রৌমারী ও রাজীবপুর হয়ে জামালপুরের বাহাদুরাবাদে গিয়ে যমুনা নামে পরিচিত হয়।
স্থানীয়দের মতে, নারায়ণপুর থেকে রাজীবপুর পর্যন্ত প্রায় ৭০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ১৯৫০-এর দশক থেকেই ভাঙন চলছে। এর ফলে কুড়িগ্রামের বহু ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা আংশিক বা সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। লক্ষাধিক মানুষ বারবার ঘর হারিয়ে নতুন করে বসতি গড়তে বাধ্য হয়েছে।
কৃষি ও অর্থনীতিতে ভয়াবহ প্রভাব
নদীভাঙনে কৃষিজমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থাপনা ও বিভিন্ন অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে স্থানীয় অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষিভিত্তিক জীবনযাপন ভেঙে পড়ায় অনেকেই পেশা বদলে দিনমজুরে পরিণত হচ্ছেন।
মানুষের জীবনে অনিশ্চয়তা ও বেদনা
উলিপুরের সাহেবের আলগার বাসিন্দা শরাফত আলী বলেন, জীবনে পাঁচবার ঘর বানিয়েছেন, প্রতিবারই নদী তা কেড়ে নিয়েছে। কোথায় যাবেন, তা জানেন না। একই এলাকার রহিলা খাতুন জানান, সব হারিয়ে এখন অন্যের জমিতে সন্তানদের নিয়ে থাকছেন, প্রতি বছর বর্ষা এলেই আতঙ্কে থাকেন।
রৌমারীর ফুলুয়ার চরের কৃষক জাইদুল ইসলাম জানান, ১০ বিঘা জমি হারিয়ে এখন দিনমজুরি করছেন। রাজীবপুরের জরিনা খাতুন বলেন, বারবার ঘর হারিয়ে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে তারা সম্পূর্ণ গৃহহীন হয়ে পড়বেন।
৮৫০ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায়
এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রায় ৮৫০ কোটি টাকার একটি নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্প প্রস্তাব করেছে। উলিপুর, রৌমারী ও রাজীবপুর উপজেলার প্রায় ১৬ দশমিক ৩০৫ কিলোমিটার নদীতীর রক্ষার পরিকল্পনা রয়েছে এতে।
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় সমীক্ষা শেষে প্রস্তাবটি পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে, তবে এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন মেলেনি।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্রহ্মপুত্র অত্যন্ত গতিশীল নদী, যা গড়ে প্রতি বছর প্রায় ৫০ মিটার পর্যন্ত তীর ভাঙে। এতে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে দারিদ্র্য ও মানবিক সংকট বাড়ছে। নদীর নাব্যতা ঠিক রাখতে নিয়মিত খননের পাশাপাশি টেকসই বাঁধ নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন। তারা বলছেন, মানুষকে পাঁচ-ছয়বার পর্যন্ত স্থান পরিবর্তন করতে হচ্ছে, স্থায়ী বাঁধ ছাড়া এই সংকট থেকে মুক্তি সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে, কুড়িগ্রামের মানুষ এখন অপেক্ষা করছে দ্রুত প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নের, যাতে অন্তত কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে আসে তাদের জীবনে।
বাংলাদেশ বিশ্বে কার্বন নিঃসরণে খুবই কম অবদান রাখলেও জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়া দেশগুলোর একটি। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের প্রতি সাতজনের একজন জলবায়ুজনিত কারণে বাস্তুচ্যুত হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















