পূর্ব আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়া নতুন ইবোলা প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় বিজ্ঞানীরা এখন কার্যকর চিকিৎসা খুঁজে বের করার জন্য সময়ের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে চলমান এই প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬৯৫ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং প্রাণ হারিয়েছেন কমপক্ষে ১৩৮ জন। উদ্বেগের বিষয় হলো, এ প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী বান্ডিবুগিও ভাইরাসের বিরুদ্ধে এখনো কোনো অনুমোদিত নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই।
চিকিৎসাকেন্দ্রে জীবন বাঁচানোর লড়াই
কঙ্গোর বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসকেরা রোগীদের শরীরে তরল সরবরাহ, রক্ত সঞ্চালন, অক্সিজেন দেওয়া এবং ব্যথা নিয়ন্ত্রণের মতো সহায়ক চিকিৎসা দিয়ে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েক বছর আগের তুলনায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে এবং এখন অনেক বেশি রোগী সুস্থ হয়ে উঠছেন। তবে ভাইরাসকে সরাসরি লক্ষ্য করে এমন কার্যকর ওষুধের অভাব এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
কেন নেই নির্দিষ্ট চিকিৎসা?

গত কয়েক দশকের অধিকাংশ ইবোলা প্রাদুর্ভাব ঘটেছে অন্য একটি ভাইরাস প্রজাতির কারণে। সেই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর দুটি চিকিৎসা বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু বান্ডিবুগিও ভাইরাস জিনগতভাবে আলাদা হওয়ায় একই ওষুধ এখানে কার্যকর হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
২০০৭ সালে প্রথম শনাক্ত হওয়ার পর বান্ডিবুগিও ভাইরাস নিয়ে কিছু গবেষণা হলেও বড় আকারের প্রাদুর্ভাব না থাকায় সেই গবেষণা আর এগোয়নি। ফলে বর্তমান সংকটের সময় বিজ্ঞানীদের নতুন করে দ্রুত কাজ শুরু করতে হয়েছে।
কোন ওষুধগুলো নিয়ে সবচেয়ে বেশি আশা?
বর্তমানে কয়েকটি সম্ভাবনাময় ওষুধ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। এর মধ্যে এমবিপি-১৩৪ নামের একটি অ্যান্টিবডি-ভিত্তিক চিকিৎসা প্রাণীর ওপর পরীক্ষায় ইতিবাচক ফল দেখিয়েছে। পাশাপাশি রেমডেসিভির নামের অ্যান্টিভাইরাল ওষুধও বিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই দুটি ওষুধ একসঙ্গে ব্যবহার করলে আরও ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। এজন্য দ্রুত ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা শুরুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
নতুন পরীক্ষার পথে গবেষকেরা
গবেষকেরা এমন এক নতুন ধরনের পরীক্ষাপদ্ধতি তৈরি করেছেন, যার মাধ্যমে বিভিন্ন ভাইরাসজনিত প্রাদুর্ভাবে একই ওষুধের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে। এতে ফলাফল দ্রুত পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে যুদ্ধ ও সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ায় গবেষণা পরিচালনা সহজ হচ্ছে না। চিকিৎসাকেন্দ্র, অবকাঠামো এবং নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
সংক্রমণ ঠেকাতেও চলছে গবেষণা
শুধু আক্রান্তদের চিকিৎসাই নয়, সংস্পর্শে আসা মানুষদের অসুস্থ হওয়া ঠেকানোর উপায়ও খুঁজছেন গবেষকেরা। এ ক্ষেত্রে ওবেলডেসিভির নামের একটি ওষুধ নিয়ে বিশেষ আগ্রহ দেখা গেছে।
প্রাণীর ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, সংক্রমণের অল্প সময়ের মধ্যেই এই ওষুধ দেওয়া হলে গুরুতর অসুস্থতা প্রতিরোধ করা সম্ভব হতে পারে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে এটি প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

চিকিৎসা আবিষ্কারের পরও বড় প্রশ্ন
সম্ভাব্য ওষুধ কার্যকর প্রমাণিত হলেও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—সেগুলো কি আফ্রিকার আক্রান্ত দেশগুলোর মানুষের কাছে সহজলভ্য হবে?
আগের ইবোলা প্রাদুর্ভাবে কার্যকর চিকিৎসা আবিষ্কৃত হলেও সরবরাহ, নিবন্ধন এবং মালিকানা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে অনেক রোগী সেই সুবিধা পাননি। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ওষুধের পরীক্ষার পাশাপাশি আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর কাছে দ্রুত ও ন্যায্যভাবে চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ইবোলার নতুন এই প্রাদুর্ভাব বিজ্ঞানীদের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তবে সম্ভাবনাময় কয়েকটি ওষুধ নিয়ে দ্রুত অগ্রগতি এবং নতুন গবেষণার কারণে আশার আলোও দেখা যাচ্ছে। কার্যকর চিকিৎসা মিললে শুধু বর্তমান সংকট নয়, ভবিষ্যতের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলাতেও বিশ্ব আরও প্রস্তুত হতে পারবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















