একসময় নিজেই বিশ্বাস করতেন না যে তাঁর মহাকাশ কোম্পানি সফল হবে। সাফল্যের সম্ভাবনা তিনি ধরেছিলেন ১০ শতাংশেরও কম। সেই কোম্পানিই এখন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি ও মহাকাশ শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্য নিয়ে নতুন ইতিহাস গড়েছে স্পেসএক্স, আর এর প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক পৌঁছেছেন এক নতুন মাইলফলকে।
সন্দেহ আর নিরুৎসাহের মধ্যেই শুরু
প্রায় ২৫ বছর আগে মহাকাশ নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখলেও বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। মঙ্গল গ্রহে গাছের বীজ পাঠানোর একটি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছিলেন ইলন মাস্ক। কিন্তু রকেটের বিপুল খরচ সেই পরিকল্পনার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
অনেক বিশেষজ্ঞ তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যে ব্যক্তিগত উদ্যোগে মহাকাশযাত্রা অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নয়। কেউ কেউ সরাসরি বলেছিলেন, এটি ব্যর্থ হওয়ারই কথা। কিন্তু সেই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেই নিজের রকেট কোম্পানি গড়ার সিদ্ধান্ত নেন মাস্ক।

ব্যর্থতার পর ব্যর্থতা
স্পেসএক্সের শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। কোম্পানির প্রথম রকেট ফ্যালকন-১ এর প্রথম দুটি উৎক্ষেপণ ব্যর্থ হয়। তৃতীয় চেষ্টাও সফল হয়নি। তখন কোম্পানির অর্থ প্রায় শেষ হয়ে আসছিল।
চতুর্থ উৎক্ষেপণও ব্যর্থ হলে হয়তো স্পেসএক্সের অস্তিত্বই শেষ হয়ে যেত। কিন্তু ২০০৮ সালে চতুর্থ প্রচেষ্টায় রকেটটি সফলভাবে কক্ষপথে পৌঁছায়। সেটিই কোম্পানির ভাগ্য বদলে দেয়।
নাসার চুক্তি বদলে দেয় ভবিষ্যৎ
ফ্যালকন-১ এর সাফল্যের পর স্পেসএক্স বড় সুযোগ পায়। প্রতিষ্ঠানটি মহাকাশ স্টেশনে সরঞ্জাম পাঠানোর জন্য বড় রকেট ও মহাকাশযান তৈরির গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি অর্জন করে।
পরবর্তীতে মহাকাশচারী পরিবহনের কাজও পায় তারা। ধীরে ধীরে কম খরচে উৎক্ষেপণ সেবা দিয়ে বিশ্ব রকেট বাজারে আধিপত্য বিস্তার করে স্পেসএক্স।
স্টারলিংক থেকে নতুন ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য

২০১৯ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে হাজার হাজার উপগ্রহ স্থাপন শুরু করে স্পেসএক্স। এই উদ্যোগই পরে কোম্পানির সবচেয়ে বড় আয়ের উৎসে পরিণত হয়।
পৃথিবীর প্রত্যন্ত অঞ্চলেও দ্রুতগতির ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা স্টারলিংককে অনন্য অবস্থানে নিয়ে যায়। এর ফলে স্পেসএক্স শুধু মহাকাশ কোম্পানি নয়, বৈশ্বিক যোগাযোগ অবকাঠামোরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
মঙ্গলে মানুষের স্বপ্ন এখনো জীবিত
ইলন মাস্কের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য মানুষের জন্য মঙ্গলে বসতি স্থাপনের পথ তৈরি করা। সেই উদ্দেশ্যে স্টারশিপ নামের বিশাল মহাকাশযান প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে চলছে স্পেসএক্স।
যদিও পরীক্ষামূলক উড্ডয়নগুলোতে সাফল্য ও ব্যর্থতা দুটিই এসেছে, তবু প্রকল্পটি ভবিষ্যতের মহাকাশ অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক পরীক্ষাগুলো নতুন আশার জন্ম দিয়েছে, যদিও পূর্ণ সফলতার জন্য এখনও সময় লাগবে।

অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প
আজকের স্পেসএক্সকে দেখে সাফল্য অবধারিত মনে হলেও বাস্তবে এটি ছিল দীর্ঘ সংগ্রাম, ঝুঁকি এবং বারবার ব্যর্থতা থেকে উঠে আসার গল্প। যে কোম্পানির সফল হওয়ার সম্ভাবনা প্রতিষ্ঠাতার কাছেই ছিল ১০ শতাংশের কম, সেই প্রতিষ্ঠানই এখন মহাকাশ শিল্পের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্পেসএক্স শুধু রকেট উৎক্ষেপণ করছে না; ভবিষ্যতের মহাকাশভিত্তিক অর্থনীতির জন্য অবকাঠামোও গড়ে তুলছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















