দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে রোবট প্রযুক্তির বিশ্বনেতা হিসেবে পরিচিত ছিল জাপান। দুই পায়ে হাঁটা, বস্তু ধরতে পারা কিংবা পিয়ানো বাজানো রোবট তৈরিতে দেশটি একসময় বিশ্বকে বিস্মিত করেছিল। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নতুন প্রজন্মের মানবসদৃশ রোবট তৈরির প্রতিযোগিতায় এখন নেতৃত্ব চলে গেছে চীনের হাতে।
সম্প্রতি টোকিওতে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক রোবট সম্মেলনে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেখানে জাপানের নিজস্ব সাফল্যের গল্পের বদলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল চীনা কোম্পানিগুলোর দ্রুত উত্থান এবং তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার উপায়।
কম দামে বিপুল উৎপাদন
চীনের রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন এমন গতিতে মানবসদৃশ রোবট তৈরি করছে, যা বিশ্বের অন্য অনেক দেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান হাজার হাজার রোবট উৎপাদন করছে, যেগুলোর দামও তুলনামূলকভাবে অনেক কম।

একসময় চীনের রোবট নির্মাতারা সেন্সর, জয়েন্ট ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের জন্য বিদেশি সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখন সেই চিত্র বদলে গেছে। অধিকাংশ যন্ত্রাংশই দেশীয়ভাবে উৎপাদিত হচ্ছে, ফলে খরচ দ্রুত কমেছে এবং উৎপাদনের গতি বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে মানবসদৃশ রোবট তৈরি করতে গেলে চীনা সরবরাহ শৃঙ্খলকে এড়িয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্পের বড় অবদান
রোবট শিল্পে চীনের অগ্রগতির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে দেশটির বৈদ্যুতিক গাড়ি খাত। বহু বছর ধরে সরকারি বিনিয়োগ ও শিল্পনীতি অনুসরণ করে চীন গাড়ির প্রায় সব ধরনের যন্ত্রাংশ নিজস্বভাবে উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তুলেছে।
আজ সেই একই কারখানা ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো রোবট শিল্পের জন্যও যন্ত্রাংশ তৈরি করছে। ফলে রোবট নির্মাতারা খুব অল্প সময়ে প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করতে পারছে এবং নতুন নকশা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হচ্ছে।
শেনজেনের প্রযুক্তি কেন্দ্রগুলোতে এমন পরিবেশ তৈরি হয়েছে যেখানে একটি নকশা সকালে পাঠালে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ত্রিমাত্রিক মুদ্রণে তৈরি যন্ত্রাংশ হাতে পাওয়া যায়।

কারখানায় বাড়ছে রোবটের ব্যবহার
মানবসদৃশ রোবট এখনও দৈনন্দিন জীবনের জটিল কাজ দক্ষভাবে করতে না পারলেও শিল্প খাতে তাদের ব্যবহার বাড়ছে। বিশেষ করে চীনের আধুনিক কারখানাগুলোতে মালপত্র বহন, পর্যবেক্ষণ এবং সহজ উৎপাদন কার্যক্রমে এসব রোবট ব্যবহার শুরু হয়েছে।
চীন ইতোমধ্যে শিল্প রোবট ব্যবহারে বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে পৌঁছেছে। দেশটির কারখানাগুলোতে লাখ লাখ রোবট কাজ করছে এবং প্রতি বছর নতুন করে বিপুল সংখ্যক রোবট স্থাপন করা হচ্ছে। অন্যদিকে বিশ্বের অনেক উন্নত বাজারে শিল্প রোবট স্থাপনের হার কমেছে।
বিনিয়োগকারীদের নজর এখন রোবটে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাস্তব প্রয়োগ হিসেবে মানবসদৃশ রোবটকে ভবিষ্যতের অন্যতম বড় প্রযুক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। সেই কারণে চীনের এই খাতে বিনিয়োগ দ্রুত বাড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রোবটভিত্তিক নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোতে কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এসেছে।

বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তারা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এসব রোবট রাসায়নিক কারখানার ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, ভারী মালামাল বহন এবং মানুষের জন্য বিপজ্জনক বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করতে পারবে।
এখনও রয়ে গেছে বড় চ্যালেঞ্জ
তবে সব অগ্রগতির পরও মানবসদৃশ রোবট প্রযুক্তি এখনও পূর্ণাঙ্গ নয়। বর্তমানে প্রদর্শনী বা অনুষ্ঠানগুলোতে দেখা অনেক রোবট পূর্বনির্ধারিত নির্দেশনা অনুসরণ করে কাজ করে। বাস্তব জীবনের দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিবেশে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলা করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, রোবটকে সত্যিকারের উৎপাদনশীল ও বহুমুখী কর্মী হিসেবে গড়ে তুলতে আরও সময় লাগবে। তবে উৎপাদন সক্ষমতা, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং বিনিয়োগের দিক থেকে চীন ইতোমধ্যেই এমন একটি অবস্থানে পৌঁছেছে, যা আগামী দিনের রোবট শিল্পে দেশটিকে দীর্ঘ সময় নেতৃত্ব দিতে সহায়তা করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















