আফ্রিকার দেশ কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের পূর্বাঞ্চলে আবারও ইবোলা ভাইরাসের বিস্তার নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নেওয়া হলে এটি ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ইবোলা প্রাদুর্ভাবগুলোর একটিতে পরিণত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাইরাসটি শনাক্ত হওয়ার আগেই কয়েক মাস ধরে ছড়িয়ে পড়ছিল। পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে এই বাস্তবতা যে, বর্তমানে শনাক্ত হওয়া এই ধরনের ইবোলার জন্য অনুমোদিত কোনো কার্যকর টিকা বা চিকিৎসা নেই। ফলে রোগটি নিয়ন্ত্রণে আনা আগের তুলনায় আরও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অতীতের অভিজ্ঞতা সতর্কবার্তা

২০১৪ সালে পশ্চিম আফ্রিকায় ইবোলার যে মহামারি ছড়িয়েছিল, তা আগের সব রেকর্ড ভেঙে দেয়। সে সময় রোগীর সংখ্যা এত দ্রুত বাড়ছিল যে হাসপাতালগুলো সামাল দিতে পারছিল না। চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে জায়গার সংকট দেখা দেয় এবং সাধারণ মানুষও ভয়ের কারণে হাসপাতালে যেতে এড়িয়ে চলতে শুরু করে।
পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সেই মহামারি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। আবার ২০১৮ সালে কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে নতুন প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে দীর্ঘ দুই বছর চেষ্টা চালিয়ে সেটি দমন করা হয়, যদিও তাতে হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
এবার পরিস্থিতি আরও কঠিন
বর্তমান সংকটের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলের অস্থিতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি। এলাকাটিতে শতাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। অনেক অঞ্চলে সরকারের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ শহর ও যোগাযোগব্যবস্থা নানা কারণে বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ত্রাণ ও চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ ছাড়া স্থানীয় জনগণের একাংশের মধ্যে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের প্রতি অবিশ্বাসও বড় বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। অতীতে এমন অবিশ্বাসের কারণে ইবোলা চিকিৎসা শিবিরে হামলা এবং নিরাপদ দাফন কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
বাস্তুচ্যুতি বাড়াচ্ছে ঝুঁকি
সংঘাত ও সহিংসতার কারণে লাখ লাখ মানুষ নিজ বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। এই ব্যাপক জনস্থানান্তর ভাইরাসের বিস্তার আরও দ্রুত ঘটাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় সংক্রমণ বেশি, সেখান থেকে মানুষের চলাচল রোগ নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলছে।
অর্থ ও জনবলের সংকট
ইবোলা মোকাবিলায় বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন, পরীক্ষাগার সুবিধা বাড়ানো, আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা, নিরাপদ দাফন নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহের জন্য বিপুল অর্থ ও জনবল প্রয়োজন।
তবে আন্তর্জাতিক সহায়তা আগের তুলনায় কমে যাওয়ায় অনেক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন মানবিক সংস্থাও অর্থসংকটের কারণে তাদের কার্যক্রম কমাতে বাধ্য হয়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ বাস্তবায়নে বিলম্ব হচ্ছে।
বিশ্বকে দ্রুত এগিয়ে আসার আহ্বান
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এখনও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার সুযোগ রয়েছে। তবে তার জন্য প্রয়োজন দ্রুত আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, গবেষণা এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ।
তাদের মতে, ইবোলা ভাইরাসকে থামানো অসম্ভব নয়। কিন্তু তা করতে হলে বিশ্বের দেশগুলোকে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাতে হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের পাশে দাঁড়াতে হবে। অন্যথায় এই প্রাদুর্ভাব আরও বড় মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















