ইরানের রাজধানী তেহরানে শনিবার চালানো বিমান হামলায় আবাসিক এলাকা ও বেসামরিক স্থাপনাগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় গণমাধ্যম ও সহায়তা সংস্থাগুলোর তথ্যে জানা যায়, একটি খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এই হামলার শিকার হয়েছে।
টানা বিস্ফোরণে আতঙ্কে রাজধানী
শুক্রবার রাত থেকে শনিবার ভোর পর্যন্ত তেহরানে একাধিক দফায় তীব্র হামলা চালানো হয়। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
তেহরানের ৬২ বছর বয়সী এক বাসিন্দা নাসরিন জানান, বিস্ফোরণের তীব্রতায় মাটি পর্যন্ত কেঁপে উঠছিল। নিরাপত্তাজনিত কারণে নিজের পুরো নাম প্রকাশ না করে তিনি বলেন, পুরো রাতজুড়ে তারা ঘুমাতে পারেননি এবং দীর্ঘ সময় ধরে বিস্ফোরণের শব্দ চলছিল।

ইসরায়েলের দাবি: সামরিক স্থাপনায় লক্ষ্যভিত্তিক হামলা
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা তেহরানে নৌ ও সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে “বৃহৎ পরিসরের হামলা” সম্পন্ন করেছে। তাদের দাবি, এই হামলা ইরানের সরকারি ব্যবস্থার মূল কাঠামো দুর্বল করার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তারা ইরানে ১১ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। তবে এসব হামলার নির্দিষ্ট অবস্থান বা বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা, ক্ষতিগ্রস্ত গবেষণা স্থাপনা
শনিবার তেহরানের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ইরান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিতে হামলার পর আগুন ও ধ্বংসস্তূপের দৃশ্য দেখা গেছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক গবেষণা ও শিক্ষামূলক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যদিও এ ঘটনায় হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই দাবি করেছেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা কেন্দ্রকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।

আবাসিক এলাকায় উদ্ধার অভিযান
ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির পর জরুরি উদ্ধার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। যদিও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর নির্দিষ্ট অবস্থান তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে
ওয়াশিংটনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৩৩০০ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ১৪৯২ জন বেসামরিক নাগরিক।
ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় হামলার প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বলছে, তাদের হামলার লক্ষ্য মূলত সামরিক স্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা, বিশেষ করে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পসের সঙ্গে যুক্ত স্থাপনাগুলো। তবে এসব হামলার অনেকগুলোই ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় হওয়ায় আশপাশের বহু ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
রেড ক্রিসেন্টের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশজুড়ে কয়েক হাজার আবাসিক ইউনিট ধ্বংস হয়ে গেছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত করছে।

অবকাঠামোতে হামলা জোরদারের ঘোষণা
ইসরায়েল ইতোমধ্যে জানিয়েছে, তারা ইরানের অবকাঠামোর ওপর হামলা আরও বাড়াবে। তাদের দাবি, যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হচ্ছে, সেগুলো অনেক ক্ষেত্রে বেসামরিক ও সামরিক উভয় কাজে ব্যবহৃত হয় অথবা সরকারি ও সামরিক সংযোগ রয়েছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরানের দুটি বড় ইস্পাত উৎপাদন কেন্দ্রেও হামলার খবর পাওয়া গেছে।
সার্বিক পরিস্থিতি
তেহরানে চলমান এই হামলা পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল করে তুলছে। সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দাবি থাকলেও বাস্তবে এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবন, আবাসন ও শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর, যা মানবিক সংকটকে আরও গভীর করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















