বাংলাদেশে চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে বিদেশি ঋণ ছাড়ে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থার ঘাটতি—সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।
ঋণ ছাড়ে বড় পতন, উদ্বেগ বাড়ছে
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ERD)-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে বিদেশি ঋণ ছাড় কমেছে প্রায় ২৬ শতাংশ। এই সময়ে উন্নয়ন সহযোগীরা মোট ৩.০৫ বিলিয়ন ডলার ছাড় করেছে, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৪.১৩ বিলিয়ন ডলার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই হ্রাস দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে এবং অর্থনীতির গতিশীলতা কমিয়ে দিতে পারে।
নির্বাচন ও প্রশাসনিক অস্থিরতার প্রভাব
ঋণ ছাড় কমার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে নির্বাচনকেন্দ্রিক ব্যস্ততা। পুরো প্রশাসন নির্বাচনের দিকে মনোযোগী থাকায় উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ধীর হয়ে পড়ে।
এছাড়া ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর অনেক প্রকল্প পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পদত্যাগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। নতুনদের নিয়োগ দিতে সময় লাগায় প্রকল্প বাস্তবায়ন ও অর্থ ছাড়—দুটিই বাধাগ্রস্ত হয়।
ঋণ পরিশোধ ও প্রাপ্তি প্রায় সমান
চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে বাংলাদেশ বিদেশি ঋণ হিসেবে যত টাকা পেয়েছে, প্রায় সমপরিমাণ অর্থই পরিশোধ করেছে। এই সময়ে মোট ২.৮৯৯ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে, যেখানে প্রাপ্তি ছিল ৩.০৫ বিলিয়ন ডলার।
এই পরিস্থিতি অর্থনীতিবিদদের কাছে উদ্বেগজনক, কারণ এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়তে পারে।
কেন বাড়ছে ঋণ পরিশোধের চাপ
পূর্ববর্তী বছরগুলোতে নেওয়া অনেক ঋণের ‘গ্রেস পিরিয়ড’ শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন মূলধন ও সুদ পরিশোধ বাড়ছে।
এই সময়ে মূল ঋণ পরিশোধ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১.৯৪৩ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় বেশি। সুদ পরিশোধও সামান্য বেড়ে প্রায় ৯৫৬ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

নতুন ঋণ প্রতিশ্রুতি বাড়লেও গতি ধীর
চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতি কিছুটা বেড়ে ২.৪৩১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে এই বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অন্তর্বর্তী সরকারের সতর্ক অবস্থান এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা নতুন ঋণ গ্রহণের গতি সীমিত রেখেছে।
রিজার্ভে চাপ ও বৈশ্বিক প্রভাব
বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ৪০-৪৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা গেলে কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতসহ বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি, পরিবহন ও বীমা খরচ বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় বাড়ছে। ফলে রিজার্ভের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।
কোন দেশ ও সংস্থা কত ঋণ দিল
এই সময়ে সবচেয়ে বেশি ঋণ ছাড় করেছে রাশিয়া, মূলত রূপপুর প্রকল্পের জন্য। এছাড়া বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, চীন, জাপান ও ভারতও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ছাড় করেছে।
অন্যদিকে নতুন ঋণ প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক।
সামনে কী চ্যালেঞ্জ
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, যদি নতুন ঋণ প্রবাহ না বাড়ে, তাহলে ভবিষ্যতে রিজার্ভের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিদেশি সহায়তা বৃদ্ধি, রপ্তানি বাড়ানো, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং সমন্বিত অর্থনৈতিক কৌশল গ্রহণ জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















