বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প ইউরোপীয় বাজারে নতুন এক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে। কার্বন নিঃসরণ কমাতে ব্যর্থ হলে ২০৩০ সালের পর এই খাতে প্রায় ৫% অতিরিক্ত কার্বন ট্যাক্স আরোপ হতে পারে—এমন সতর্কবার্তা উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়। তবে শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইতোমধ্যে সবুজ উৎপাদনে রূপান্তরের পথে অনেক কারখানা এগিয়ে গেছে, ফলে আতঙ্কের তেমন কারণ দেখছেন না তারা।
ইইউর নতুন নীতি ও সম্ভাব্য চাপ
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) তাদের সরবরাহ শৃঙ্খলে কার্বন নিঃসরণ কমাতে Carbon Border Adjustment Mechanism (CBAM) চালু করেছে। এই নীতির আওতায় ভবিষ্যতে পোশাক খাতও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
গবেষণা অনুযায়ী, বর্তমান হারে নিঃসরণ চলতে থাকলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে প্রায় ৪.৮% কার্বন ট্যাক্স আরোপ হতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হবে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর শুল্ক সুবিধা হারানোর প্রভাব। তখন গড় ১২% শুল্কের সঙ্গে কার্বন ট্যাক্স মিলিয়ে মোট শুল্কের বোঝা দাঁড়াতে পারে প্রায় ১৭%।
এই গবেষণা পরিচালনা করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)-এর বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান ও গবেষক মোহাম্মদ ইমরান কবির।
এলডিসি উত্তরণ: বাড়তি চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ ২০২৬ সালের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ ঘটাবে। যদিও ইইউ ২০২৯ পর্যন্ত কিছু বাণিজ্য সুবিধা দিতে পারে, তবুও ২০২৬-২০২৯ সময়েও CBAM চালু হলে পোশাক খাতে কার্বন ট্যাক্স আরোপের ঝুঁকি থাকবে।
বাংলাদেশের মোট রপ্তানির বড় অংশই আসে পোশাক খাত থেকে, যার অর্ধেকেরও বেশি যায় ইউরোপীয় বাজারে। ফলে এই নতুন নীতি দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

শিল্প খাতের প্রস্তুতি ও আশাবাদ
পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা ইতোমধ্যে প্রস্তুতি শুরু করেছেন। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু জানিয়েছেন, ইইউর মানদণ্ড অনুযায়ী ৩০% নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
দেশে ইতোমধ্যে প্রায় ৩০০টি সবুজ কারখানা গড়ে উঠেছে, যা বিশ্বে অন্যতম সর্বোচ্চ। এসব কারখানায় শক্তি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই অগ্রগতি সত্ত্বেও ইইউর সব শর্ত পূরণে এখনও কিছু ঘাটতি রয়েছে।
পরিষ্কার জ্বালানির ওপর জোর
গবেষণায় বলা হয়েছে, ভবিষ্যৎ ঝুঁকি এড়াতে বাংলাদেশকে দ্রুত পরিষ্কার জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এজন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের সুপারিশ করা হয়েছে—
সরকারি প্রণোদনার মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি আমদানিতে শুল্ক কমানো, স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা দিয়ে সবুজ কারখানা স্থাপন, নির্গমন কমাতে কঠোর নীতি বাস্তবায়ন এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি।
এছাড়া CBAM পর্যবেক্ষণে আলাদা কাঠামো তৈরি, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) সঙ্গে সমন্বয়, দেশে কার্বন মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা চালু এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিকে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে
বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কঠোর নীতির দিকে ঝুঁকছে উন্নত দেশগুলো। ফলে বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে এখনই পরিবেশবান্ধব উৎপাদনে পুরোপুরি রূপান্তর ঘটাতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তন শুধু চ্যালেঞ্জ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগও—কারণ সবুজ শিল্পই ভবিষ্যতের বাজারে টিকে থাকার প্রধান শর্ত হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















