০৯:১৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬
ইউরোপের ‘গানস বনাম বাটার’ সংকট তীব্রতর, ইরান যুদ্ধ নতুন চাপ তৈরি করেছে জ্বালানি সংকটে আবারও ‘কমিউনিটি প্যান্ট্রি’ আন্দোলন বাংলার ভোটার তালিকা থেকে মীর জাফরের ৩৪৬ বংশধর বাদ, নির্বাচনে অংশগ্রহণ অনিশ্চিত ফের ঊর্ধ্বমুখী সোনার বাজার: ভরিতে বাড়ল ৩,২৬৬ টাকা, ২২ ক্যারেট এখন ২,৪৪,৭১১ টাকা জ্বালানি সংকটে স্কুলে হাইব্রিড ক্লাস চালুর পরিকল্পনা, ষষ্ঠ দিনও বিবেচনায়: শিক্ষামন্ত্রী আজ মধ্যরাতেই শেষ হচ্ছে অনলাইন আয়কর রিটার্ন দাখিলের সুযোগ ইস্টার সানডেতে সরকারি ছুটির দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন ঈদযাত্রায় ১৫ দিনে ৩৯৪ জনের মৃত্যু: মোটরসাইকেল সবচেয়ে মরণঘাতী বাহন ৩০ বছরের পুরনো সেতু ধসে সুনামগঞ্জে ৫০ হাজার মানুষ কার্যত বিচ্ছিন্ন বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে ঝিনাইদহে সাইকেলচালক নিহত, আহত ৫ জন হাসপাতালে

জ্বালানি সংকটে লড়াই: রেশনিং, ডিজিটাল নজরদারি ও কঠোর নীতির নতুন বাস্তবতা

মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগার পর এশিয়ার দেশগুলো এক অভূতপূর্ব সংকট মোকাবিলা করছে। সীমিত জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সরকারগুলো এখন একদিকে পুরনো ধাঁচের রেশনিং, অন্যদিকে আধুনিক ডিজিটাল নজরদারির সমন্বয়ে নতুন নীতি গ্রহণ করছে, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে বদলে দিচ্ছে।

জ্বালানি সংকটের পটভূমি
হরমুজ প্রণালীতে জটিলতা ও ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। ফলে এশিয়ার বহু দেশ সীমিত জ্বালানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। প্রাথমিকভাবে কৌশলগত মজুত ব্যবহার করা হলেও দ্রুত তা কমে আসায় সরকারগুলোকে নতুন কৌশল গ্রহণ করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশের পদক্ষেপ
বাংলাদেশ তার মোট জ্বালানির প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে মার্চের শুরুতেই সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন কঠোর স্তরভিত্তিক রেশনিং চালু করেছে।

চাহিদা কমাতে ঈদুল ফিতরের ছুটি এক সপ্তাহ এগিয়ে আনা হয় এবং রমজানে স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখা হয়। এর ফলে জ্বালানির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী মাসিক চাহিদা ৩ লাখ ৮০ হাজার টন থেকে কমে ২ লাখ ৭০ হাজার টনে নেমেছে। তবে বাস্তবে এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন এবং “পেট্রোল শেষ” সাইনবোর্ডে। পাশাপাশি দাম স্থিতিশীল রাখতে সরকারকে প্রতিদিন প্রায় ১৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

অড-ইভেন পদ্ধতির প্রত্যাবর্তন
জ্বালানি সাশ্রয়ে অনেক দেশ আবার “অড-ইভেন” নম্বর প্লেট পদ্ধতি চালু করেছে। এই ব্যবস্থায় বিজোড় তারিখে শুধু বিজোড় নম্বরের গাড়ি এবং জোড় তারিখে জোড় নম্বরের গাড়ি জ্বালানি নিতে পারে।

শ্রীলঙ্কা ২০২৬ সালের ১৯ মার্চ এই নিয়ম আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করে, যার ফলে জ্বালানির চাহিদা তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় ৫০ শতাংশ কমে যায়।

মিয়ানমারে সামরিক সরকার প্রধান শহরগুলোতে বিকল্প দিনে গাড়ি চালানোর নিয়ম চালু করেছে। পাকিস্তানেও করাচি ও লাহোরে এই পদ্ধতি চালুর প্রস্তাব এসেছে।

Impact Of Global Energy Crisis On Bangladesh Electricity Supply | Tackling  war fallout: Govt eyes power rationing to conserve energy | The Daily Star

ডিজিটাল ফুয়েল পাসপোর্ট
শুধু রেশনিং নয়, প্রযুক্তি ব্যবহার করে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ চালু হয়েছে। শ্রীলঙ্কা “ন্যাশনাল ফুয়েল পাস” নামে একটি কিউআর কোডভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করেছে।

প্রতিটি যানবাহনের জন্য একটি নির্দিষ্ট কোটা নির্ধারণ করা হয়। পাম্পে গিয়ে কিউআর কোড স্ক্যান করলে কেন্দ্রীয় সিস্টেম থেকে তা যাচাই করা হয়। নির্ধারিত সীমা শেষ হলে সাত দিনের জন্য সেই কোড নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।

পাকিস্তানও একই ধরনের ডিজিটাল অ্যাপ চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেখানে রিকশা, গণপরিবহন ও মোটরসাইকেলের মতো খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভর্তুকি মূল্যে জ্বালানি দেওয়া হবে এবং কালোবাজারি ঠেকানো হবে।

কর্মসংস্কৃতিতে পরিবর্তন
জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য কর্মক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। অনেক দেশে চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু হয়েছে এবং ব্যাপকভাবে বাসা থেকে কাজ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

পাকিস্তানে সরকারি কর্মচারীদের জন্য চার দিনের কর্মসপ্তাহ ঘোষণা করা হয়েছে এবং অন্তত ৫০ শতাংশ কর্মীকে বাসা থেকে কাজ করতে বলা হয়েছে।

ফিলিপাইনে একই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শ্রীলঙ্কা আরও একধাপ এগিয়ে সপ্তাহের মাঝখানে একদিন সম্পূর্ণ “স্টে-অ্যাট-হোম” দিবস ঘোষণা করেছে, যাতে জ্বালানি খরচ কমে।

দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কৌশল
এই সংকট শুধু স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতিতেও বড় পরিবর্তন আনছে। এলএনজি-নির্ভরতা এখন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া দ্রুত পারমাণবিক শক্তির দিকে ঝুঁকছে। ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন প্রথমবারের মতো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিচ্ছে।

অন্যদিকে, অনেক দেশ আবার কয়লার ব্যবহার বাড়িয়েছে। ভারত জরুরি আইন প্রয়োগ করে কয়লা উৎপাদন বিদ্যুৎ খাতে সরিয়ে দিয়েছে এবং শিল্পখাতে ব্যবহৃত গ্যাস রান্নার কাজে সরবরাহ করছে।

বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ আপাতত নমনীয় ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি অনুসরণ করছে। তবে সংকট দীর্ঘায়িত হলে কঠোর রেশনিং বা ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণে যেতে হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কোনো একক সমাধান নেই। প্রতিটি নীতিরই সুবিধা ও ঝুঁকি রয়েছে। জ্বালানি সাশ্রয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জনজীবনের স্বাভাবিকতা—এই তিনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

জনপ্রিয় সংবাদ

ইউরোপের ‘গানস বনাম বাটার’ সংকট তীব্রতর, ইরান যুদ্ধ নতুন চাপ তৈরি করেছে

জ্বালানি সংকটে লড়াই: রেশনিং, ডিজিটাল নজরদারি ও কঠোর নীতির নতুন বাস্তবতা

০৭:১৮:৪৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগার পর এশিয়ার দেশগুলো এক অভূতপূর্ব সংকট মোকাবিলা করছে। সীমিত জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সরকারগুলো এখন একদিকে পুরনো ধাঁচের রেশনিং, অন্যদিকে আধুনিক ডিজিটাল নজরদারির সমন্বয়ে নতুন নীতি গ্রহণ করছে, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে বদলে দিচ্ছে।

জ্বালানি সংকটের পটভূমি
হরমুজ প্রণালীতে জটিলতা ও ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। ফলে এশিয়ার বহু দেশ সীমিত জ্বালানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। প্রাথমিকভাবে কৌশলগত মজুত ব্যবহার করা হলেও দ্রুত তা কমে আসায় সরকারগুলোকে নতুন কৌশল গ্রহণ করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশের পদক্ষেপ
বাংলাদেশ তার মোট জ্বালানির প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে মার্চের শুরুতেই সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন কঠোর স্তরভিত্তিক রেশনিং চালু করেছে।

চাহিদা কমাতে ঈদুল ফিতরের ছুটি এক সপ্তাহ এগিয়ে আনা হয় এবং রমজানে স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখা হয়। এর ফলে জ্বালানির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী মাসিক চাহিদা ৩ লাখ ৮০ হাজার টন থেকে কমে ২ লাখ ৭০ হাজার টনে নেমেছে। তবে বাস্তবে এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন এবং “পেট্রোল শেষ” সাইনবোর্ডে। পাশাপাশি দাম স্থিতিশীল রাখতে সরকারকে প্রতিদিন প্রায় ১৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

অড-ইভেন পদ্ধতির প্রত্যাবর্তন
জ্বালানি সাশ্রয়ে অনেক দেশ আবার “অড-ইভেন” নম্বর প্লেট পদ্ধতি চালু করেছে। এই ব্যবস্থায় বিজোড় তারিখে শুধু বিজোড় নম্বরের গাড়ি এবং জোড় তারিখে জোড় নম্বরের গাড়ি জ্বালানি নিতে পারে।

শ্রীলঙ্কা ২০২৬ সালের ১৯ মার্চ এই নিয়ম আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করে, যার ফলে জ্বালানির চাহিদা তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় ৫০ শতাংশ কমে যায়।

মিয়ানমারে সামরিক সরকার প্রধান শহরগুলোতে বিকল্প দিনে গাড়ি চালানোর নিয়ম চালু করেছে। পাকিস্তানেও করাচি ও লাহোরে এই পদ্ধতি চালুর প্রস্তাব এসেছে।

Impact Of Global Energy Crisis On Bangladesh Electricity Supply | Tackling  war fallout: Govt eyes power rationing to conserve energy | The Daily Star

ডিজিটাল ফুয়েল পাসপোর্ট
শুধু রেশনিং নয়, প্রযুক্তি ব্যবহার করে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ চালু হয়েছে। শ্রীলঙ্কা “ন্যাশনাল ফুয়েল পাস” নামে একটি কিউআর কোডভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করেছে।

প্রতিটি যানবাহনের জন্য একটি নির্দিষ্ট কোটা নির্ধারণ করা হয়। পাম্পে গিয়ে কিউআর কোড স্ক্যান করলে কেন্দ্রীয় সিস্টেম থেকে তা যাচাই করা হয়। নির্ধারিত সীমা শেষ হলে সাত দিনের জন্য সেই কোড নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।

পাকিস্তানও একই ধরনের ডিজিটাল অ্যাপ চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেখানে রিকশা, গণপরিবহন ও মোটরসাইকেলের মতো খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভর্তুকি মূল্যে জ্বালানি দেওয়া হবে এবং কালোবাজারি ঠেকানো হবে।

কর্মসংস্কৃতিতে পরিবর্তন
জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য কর্মক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। অনেক দেশে চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু হয়েছে এবং ব্যাপকভাবে বাসা থেকে কাজ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

পাকিস্তানে সরকারি কর্মচারীদের জন্য চার দিনের কর্মসপ্তাহ ঘোষণা করা হয়েছে এবং অন্তত ৫০ শতাংশ কর্মীকে বাসা থেকে কাজ করতে বলা হয়েছে।

ফিলিপাইনে একই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শ্রীলঙ্কা আরও একধাপ এগিয়ে সপ্তাহের মাঝখানে একদিন সম্পূর্ণ “স্টে-অ্যাট-হোম” দিবস ঘোষণা করেছে, যাতে জ্বালানি খরচ কমে।

দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কৌশল
এই সংকট শুধু স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতিতেও বড় পরিবর্তন আনছে। এলএনজি-নির্ভরতা এখন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া দ্রুত পারমাণবিক শক্তির দিকে ঝুঁকছে। ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন প্রথমবারের মতো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিচ্ছে।

অন্যদিকে, অনেক দেশ আবার কয়লার ব্যবহার বাড়িয়েছে। ভারত জরুরি আইন প্রয়োগ করে কয়লা উৎপাদন বিদ্যুৎ খাতে সরিয়ে দিয়েছে এবং শিল্পখাতে ব্যবহৃত গ্যাস রান্নার কাজে সরবরাহ করছে।

বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ আপাতত নমনীয় ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি অনুসরণ করছে। তবে সংকট দীর্ঘায়িত হলে কঠোর রেশনিং বা ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণে যেতে হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কোনো একক সমাধান নেই। প্রতিটি নীতিরই সুবিধা ও ঝুঁকি রয়েছে। জ্বালানি সাশ্রয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জনজীবনের স্বাভাবিকতা—এই তিনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।