যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির পরও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়নি। যুদ্ধ থামার বদলে লেবাননে ইসরাইলের সবচেয়ে ভারী হামলাগুলোর একটি দেখা গেছে, যাতে শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। একই সঙ্গে ইরান জানিয়ে দিয়েছে, এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্থায়ী শান্তি আলোচনা এগিয়ে নেওয়া ‘অযৌক্তিক’ বলে মনে হচ্ছে।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, যুদ্ধবিরতির কয়েকটি শর্ত ইতিমধ্যেই লঙ্ঘিত হয়েছে। তার অভিযোগ, ইসরাইল লেবাননে হামলা বাড়িয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি পরিত্যাগের দাবি তুলে সমঝোতার পরিবেশ নষ্ট করেছে। ফলে সামনে নির্ধারিত আলোচনা আদৌ হবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
লেবানন যুদ্ধবিরতির বাইরে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল দু’পক্ষই স্পষ্ট করে বলেছে, এই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি লেবাননের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, প্রয়োজন হলে যে কোনো মুহূর্তে আবার আরও জোরালো সামরিক অভিযান চালানো হবে। এ অবস্থায় ইরান ভেবেছিল যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবাননও থাকবে, কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। এই বিভ্রান্তিই নতুন উত্তেজনাকে আরও তীব্র করেছে।
পারমাণবিক ইস্যুতে গভীর মতবিরোধ
সংকটের আরেকটি বড় কারণ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধে রাজি হয়েছে এবং তাদের মজুত উপকরণও হস্তান্তরের ইঙ্গিত দিয়েছে। কিন্তু ইরানের পক্ষ থেকে একেবারেই ভিন্ন বার্তা এসেছে। গালিবাফ বলেছেন, যুদ্ধবিরতির শর্তের মধ্যে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ যুদ্ধ বন্ধের ঘোষণা এলেও মূল বিরোধের জায়গা অপরিবর্তিত রয়েছে।
লেবাননে ভয়াবহ প্রাণহানি
বুধবার লেবাননে ইসরাইলি হামলায় ২৫৪ জন নিহত হয়েছে বলে দেশটির সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে। শুধু রাজধানী বৈরুতেই নিহত ৯১ জন। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেছেন, বহু হামলার আগে সাধারণ মানুষকে সরে যাওয়ার স্বাভাবিক সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়নি। এর জবাবে হিজবুল্লাহ বৃহস্পতিবার ভোরে উত্তর ইসরাইলে রকেট ছোড়ার কথা জানিয়েছে। ফলে যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও সীমান্তজুড়ে পাল্টাপাল্টি হামলা থামেনি।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ লেবাননে ইসরাইলের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তার বক্তব্য, লেবাননকেও পূর্ণভাবে যুদ্ধবিরতির আওতায় আনতে হবে। এ ছাড়া ইউরোপের ১৩টি দেশ, জাপান এবং কানাডা যৌথ বিবৃতিতে দ্রুত সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এই অস্থিরতা দীর্ঘ হলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামোও চাপে

সংঘাত এখন শুধু ইরান-ইসরাইল বা লেবানন সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের জ্বালানি স্থাপনাতেও আঘাত হেনেছে। সৌদি আরবের একটি পাইপলাইন, যা হরমুজ প্রণালির বিকল্প সরবরাহপথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, সেটিও আঘাতের মুখে পড়েছে। কুয়েত, বাহরাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার কথা জানিয়েছে। এর ফলে আঞ্চলিক জ্বালানি নিরাপত্তা নতুন করে হুমকিতে পড়েছে।
হরমুজে অনিশ্চয়তা, বাজারে স্বস্তি
হরমুজ প্রণালিতে চলাচল এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। অনুমতি ছাড়া জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে, আর শিপিং কোম্পানিগুলো পরিষ্কার নিরাপত্তা নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত পুরোপুরি স্বাভাবিক রুটে ফিরতে চাইছে না। তবু যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে তাৎক্ষণিক স্বস্তি দেখা গেছে। তেলের দাম প্রায় ১৪ শতাংশ নেমেছে এবং শেয়ারবাজারে উল্লম্ফন হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রতিক্রিয়া স্থায়ী হবে কি না, তা নির্ভর করছে যুদ্ধবিরতি বাস্তবে কতটা টিকে থাকে তার ওপর।
ইরানের ভেতরে স্বস্তি, কিন্তু সংশয়ও আছে

ইরানে যুদ্ধবিরতির খবরে অনেক মানুষ রাস্তায় নেমে উদ্যাপন করেছে। কিন্তু জনমনে স্বস্তির পাশাপাশি প্রবল সংশয়ও রয়ে গেছে। কারণ, সাধারণ মানুষের আশঙ্কা—কূটনীতি আবার ভেঙে পড়তে পারে, আর নতুন হামলাও শুরু হতে পারে। এই মানসিক অবস্থা থেকেই বোঝা যায়, যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলেও স্থায়ী শান্তির ওপর আস্থা এখনো খুবই দুর্বল।
ক্ষমতার সমীকরণে নতুন বাস্তবতা
প্রতিবেদনটি দেখাচ্ছে, কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধের পরও কোনো পক্ষই তাদের মূল লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সামরিক সাফল্যের দাবি করলেও ইরান এখনো তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত এবং ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন হামলার সক্ষমতা ধরে রেখেছে। একই সঙ্গে ইরানের শাসকগোষ্ঠীর ভেতরে তাৎক্ষণিক পতনেরও কোনো লক্ষণ নেই। ফলে এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে শুধু সামরিক উত্তেজনাই বাড়ায়নি, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যও নতুনভাবে বদলে দিয়েছে।
সামনের প্রশ্ন
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছে, অন্যদিকে লেবাননে হামলা চলছে, হরমুজ অনিশ্চিত, পারমাণবিক আলোচনা ঝুলে আছে, আর উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামোও ঝুঁকিতে। ফলে শনিবারের সম্ভাব্য আলোচনা শুরু হলেও তা স্থায়ী সমাধানের পথ খুলবে, নাকি আরও বড় সংঘাতের আগে সাময়িক বিরতি হিসেবেই থেকে যাবে—এখন সেই প্রশ্নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















