মিয়ানমারের সামরিক শাসক মিন অং হ্লাইং প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। বৃহস্পতিবার দেশটির পার্লামেন্ট তার নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের জন্য ৩০ জন মন্ত্রীর তালিকা অনুমোদন করেছে। তবে নতুন এই মন্ত্রিসভায়ও সেনাবাহিনীর প্রভাব আগের মতোই শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
বিতর্কিত নির্বাচনের পর নতুন সরকার
এই পদক্ষেপ এসেছে এমন এক নির্বাচনের পর, যেটিকে মিয়ানমারে বেসামরিক শাসনে ফেরার পথ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু ওই নির্বাচনে সেনাসমর্থিত দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির জয় নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। জাতিসংঘসহ বহু পশ্চিমা দেশ এই নির্বাচনকে প্রহসন বলে আখ্যা দিয়েছে।
পুরোনো ধারারই পুনরাবৃত্তি
নতুন মন্ত্রিসভার তালিকা দেখে বিশ্লেষকদের অনেকেরই ধারণা, মিন অং হ্লাইং মূলত আগের পথেই এগোচ্ছেন। তার নিয়োগ পাওয়া বেশিরভাগ ব্যক্তি অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা অথবা আগের প্রশাসনেরই পরিচিত মুখ। ফলে প্রশাসনিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে না।

কোন কোন পদে পরিবর্তন
প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল মং মং আই অবসর নিয়েছেন। তার জায়গায় দায়িত্ব পেয়েছেন সাবেক বিমানবাহিনী প্রধান জেনারেল তুন অং। সীমান্তবিষয়ক মন্ত্রী লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়ার প্যে পদ ছেড়েছেন। তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফোনে মিয়াত।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন চীনে মিয়ানমারের সাবেক রাষ্ট্রদূত তিন মং সোয়ে। তিনি আগে ব্রিটেনেও সামরিক অ্যাটাশে হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
পুরোনো সামরিক মুখদের প্রত্যাবর্তন
২০২১ সালের সেনা অভ্যুত্থানের পর জান্তা সরকারের হয়ে দায়িত্ব পালন করা কয়েকজন সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রীকেও আবার নতুন মন্ত্রিসভায় রাখা হয়েছে। এদের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল মিয়া তুন উ এবং টিন অং সান উল্লেখযোগ্য।
এ ছাড়া আরও ১৪টি মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে সাবেক কর্মকর্তাদের মনোনয়ন দিয়েছেন মিন অং হ্লাইং। এর ফলে আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ এবং বিচার বিভাগ—সব ক্ষেত্রেই সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ও প্রাক্তন পুলিশ প্রধানদের প্রভাব আরও বিস্তৃত হলো।
বিশ্লেষকদের চোখে কী বার্তা
বিশ্লেষকদের মতে, এসব নিয়োগ স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে মিয়ানমারে কাঠামোগত কোনো বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা খুবই কম। পুরোনো ক্ষমতাকাঠামো কেবল পোশাক বদলাচ্ছে, কিন্তু প্রভাব এবং নিয়ন্ত্রণ একই হাতে থাকছে।
স্বাধীন বিশ্লেষক অং কিয়াও সোয়ের ভাষায়, মিন অং হ্লাইং এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করেছেন যেখানে সামরিক কর্মকর্তারা বেসামরিক পোশাকে প্রশাসন চালান, কিন্তু প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ তার হাতেই কেন্দ্রীভূত থাকে।
তার মতে, এই ব্যবস্থার মধ্যে মিয়ানমারে সত্যিকারের অগ্রগতির আশা করার খুব কম কারণ আছে।
২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে অস্থিরতা
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকেই মিয়ানমার সহিংসতা ও অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে। ওই অভ্যুত্থানে দেশটির সেনাবাহিনী, যা তাতমাদাও নামেও পরিচিত, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে। সেই সরকারের নেতৃত্বে ছিলেন নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী অং সান সু চি।
নতুন মন্ত্রিসভা ঘোষণার মধ্য দিয়ে তাই আবারও স্পষ্ট হলো, মিয়ানমারে বাহ্যিকভাবে প্রশাসনিক পরিবর্তন এলেও রাষ্ট্রক্ষমতার মূল নিয়ন্ত্রণ এখনো সেনাবাহিনীর হাতেই রয়ে গেছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















