দুবাইয়ে শুক্রবার সকালে আবারও স্বর্ণের দাম কমেছে। আগের দিনের তুলনায় প্রতি গ্রামে ৪ দিরহাম পর্যন্ত কমে স্থানীয় বাজারে এক ধরনের সতর্ক প্রবণতা দেখা গেছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের চিত্র বলছে, সামগ্রিকভাবে সপ্তাহটি এখনও স্বর্ণের জন্য শক্ত অবস্থানেই শেষ হতে পারে।
শুক্রবার সকাল ৯টা ১৯ মিনিটে ২৪ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ছিল ৫৭৩ দশমিক ২৫ দিরহাম। এক দিন আগে এই দাম ছিল ৫৭৭ দশমিক ২৫ দিরহাম। একইভাবে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ৫৩৪ দশমিক ৫০ দিরহাম থেকে নেমে ৫৩০ দশমিক ৭৫ দিরহামে এসেছে। অর্থাৎ স্থানীয় বাজারে কিছুটা দরপতন হলেও তা আপাতত সীমিত পরিসরেই রয়েছে।
আন্তর্জাতিক দাম শক্ত, স্থানীয় পতন সাময়িক
স্থানীয় বাজারে দাম কমলেও আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণ এখনও শক্ত অবস্থানে রয়েছে। বৈশ্বিক বাজারে টানা তৃতীয় সপ্তাহের মতো দাম বাড়ার পথে রয়েছে স্বর্ণ। প্রতি আউন্সের দাম প্রায় ৪ হাজার ৭৬০ ডলারের কাছাকাছি রয়েছে এবং সাপ্তাহিক হিসাবে প্রায় ২ শতাংশ ঊর্ধ্বগতির ইঙ্গিত মিলছে।
বিশ্ববাজারে এই সমর্থনের পেছনে রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর অব্যাহত স্বর্ণ ক্রয় এবং ইরান সংকট ঘিরে সম্ভাব্য কূটনৈতিক তৎপরতা। বাজারের দৃষ্টি এখন ইসলামাবাদে সম্ভাব্য আলোচনার দিকে, যেখানে সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের কথা আলোচনায় রয়েছে।

ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা স্বর্ণে চাহিদা বাড়াচ্ছে
একই সময়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন সতর্কবার্তা এবং অঞ্চলে চলমান হামলা-পাল্টা হামলা ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সাধারণত এ ধরনের ঝুঁকি বাড়লে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ফলে স্বর্ণের দামে সমর্থন তৈরি হয়।
মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাজারকে জটিল করছে
স্বর্ণের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনায় এখন বড় ভূমিকা রাখছে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা। সংঘাতের জেরে জ্বালানির খরচ বাড়তে থাকায় এমন ধারণা জোরালো হচ্ছে যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদ কমানোর সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে পারে, বা দীর্ঘ সময় ঋণের খরচ উঁচু রাখতেই পারে।
এই পরিস্থিতি সাধারণত স্বর্ণের জন্য কিছুটা নেতিবাচক, কারণ স্বর্ণ থেকে সুদ বা মুনাফা আসে না। তবে সংঘাত দীর্ঘ হলে প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে যেতে পারে, তখন নীতিনির্ধারকদের অবস্থান উল্টোদিকে যেতে পারে। সেই পরিস্থিতিতে আবারও স্বর্ণ উপকার পেতে পারে।
সাম্প্রতিক তথ্যও চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে ফেব্রুয়ারিতে ভোক্তা ব্যয় খুব বেশি বাড়েনি। এর মধ্যেই বাজার অপেক্ষা করছে মার্চ মাসের মূল্যস্ফীতির তথ্যের জন্য, যা শুক্রবার পরে প্রকাশ হওয়ার কথা এবং এতে ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ের পর সবচেয়ে বড় মাসভিত্তিক বৃদ্ধির আভাস পাওয়া যেতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কেনাকাটা দামে ভরসা জোগাচ্ছে
প্রাতিষ্ঠানিক কেনাকাটা এখনও স্বর্ণের দামের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভরসা হয়ে আছে। পোল্যান্ড স্বর্ণের মজুত ৭০০ টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে। অন্যদিকে চীন মার্চ মাসে প্রায় ৫ টন স্বর্ণ কিনেছে, যা এক বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে তাদের সবচেয়ে বড় মাসিক ক্রয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর এই ধারাবাহিক স্বর্ণ সঞ্চয় উচ্চ সুদের আশঙ্কা এবং বিনিয়োগকারীদের অবস্থান বদলের চাপের একটি অংশ সামলে দিচ্ছে।
এ মাসে দামের ওঠানামা কেমন ছিল
এপ্রিলের শুরুতে দুবাইয়ের স্বর্ণের দাম ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। মাসের শুরুতে ২৪ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ছিল প্রায় ৫৭৩ দিরহাম। পরে ৬ এপ্রিলের দিকে তা নেমে প্রায় ৫৬১ দিরহামের কাছাকাছি যায়। এরপর বাজারে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর প্রবণতা দেখা যায় এবং ৯ এপ্রিল দাম উঠে ৫৭৭ দিরহামে পৌঁছে। কিন্তু শুক্রবার আবার তা নেমে ৫৭৩ দশমিক ২৫ দিরহামে আসে।
এই ওঠানামা দেখাচ্ছে, বাজার এখন বিশ্ব পরিস্থিতির প্রতি খুব দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। বড় কোনো একমুখী প্রবণতার বদলে স্বল্পমেয়াদি উত্থানের পর হালকা সংশোধন দেখা যাচ্ছে।

ক্রেতাদের জন্য সাময়িক সুযোগ, তবে ঝুঁকি রয়ে গেছে
সাম্প্রতিক এই দরপতন গয়না ক্রেতাদের জন্য অল্প সময়ের একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে যারা স্বল্পমেয়াদি দামের ওঠানামা নজরে রাখেন। তবে সামগ্রিক প্রবণতা এখনও আন্তর্জাতিক নানা বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতির তথ্য এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ ক্রয়—সব মিলিয়ে বাজারে অস্থিরতা বজায় রয়েছে।
তাই আপাতত দাম কমলেও এটিকে বড় ধরনের নিম্নমুখী মোড় বলে দেখার সুযোগ কম। বরং এটি স্বল্পমেয়াদি সমন্বয়, আর স্বর্ণের বাজার এখনও সতর্কভাবে উচ্চমুখী চাপের মধ্যেই রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















