মালাউইয়ের এক প্রত্যন্ত গ্রামে এক শীতল সকালের ঘটনা আজও স্থানীয়দের মনে আতঙ্ক হয়ে রয়ে গেছে। ২০২৩ সালের জুনে নিজের জমিতে কুমড়োর পাতা তুলছিলেন মাসিয়ে বান্দা। হঠাৎ একটি হাতি তার দিকে ছুটে আসে। প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ানোর চেষ্টা করলেও শেষ রক্ষা হয়নি। তার পিঠে থাকা দুই বছরের মেয়ে বিয়াট্রিসকে শুঁড়ে তুলে ছুড়ে ফেলে দিয়ে হাতিটি তাকে পিষে হত্যা করে। পেছনে রেখে যায় স্বামী ও পাঁচ সন্তান।
স্থানান্তরেই বাড়ল বিপদ
যে হাতিটি বান্দাকে হত্যা করে, সেটি আগের বছরই অন্য একটি উদ্যান থেকে এখানে আনা হয়েছিল। মালাউই ও জাম্বিয়ার সীমান্তে অবস্থিত একটি জাতীয় উদ্যানে ২৬২টি হাতির সঙ্গে সেটিও স্থানান্তর করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল একটি এলাকায় অতিরিক্ত হাতির চাপ কমানো এবং অন্য এলাকায় হাতির সংখ্যা বাড়ানো।
কিন্তু এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের দাবি, ২০২২ সালের পর থেকে অন্তত ১২ জন মানুষ হাতির আক্রমণে মারা গেছেন এবং হাজারো মানুষ তাদের জীবিকা হারিয়েছেন। একই সঙ্গে ক্ষুব্ধ কৃষকদের হাতে অন্তত ৮০টি হাতিও মারা গেছে।
ফসলের মাঠে নেমে আসে ধ্বংস
হাতিগুলোর আগের আবাস ছিল সবুজ ও খাদ্যসমৃদ্ধ। কিন্তু নতুন এলাকায় খাদ্যের অভাব থাকায় তারা আশপাশের কৃষিজমিতে ঢুকে পড়ে। ভুট্টা, তরমুজ ও কুমড়োর মতো ফসল তাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে। ফলে কৃষকদের ফসল নষ্ট হয়, বাড়িঘর ভাঙচুর হয়, এমনকি মানুষও আক্রান্ত হয়।
এই পরিস্থিতি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বৃহত্তর একটি প্রবণতার প্রতিফলন। আফ্রিকার জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর বসবাসের সীমারেখা ক্রমেই কাছাকাছি চলে আসছে। যেসব এলাকা একসময় বন্যপ্রাণীর জন্য নির্ধারিত ছিল, সেগুলো এখন মানুষের বসতি ও চাষাবাদের জমিতে পরিণত হয়েছে।
বাড়ছে আইনগত বিতর্ক
এই সংঘাতের জন্য দায় কার, তা নিয়েও শুরু হয়েছে বিতর্ক। ক্ষতিগ্রস্তদের একটি অংশ মনে করছেন, হাতি স্থানান্তরের পরিকল্পনা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। তারা একটি যৌথ মামলার কথা ভাবছেন, যা সফল হলে এটি হবে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংস্থার বিরুদ্ধে প্রথম বড় ধরনের আইনি পদক্ষেপ।
অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট সংস্থা অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, এই সিদ্ধান্ত সরকারের ছিল এবং হাতি স্থানান্তর বহু বছর ধরেই সংরক্ষণের একটি স্বীকৃত পদ্ধতি। তাদের দাবি, সরকারি পরিসংখ্যানে সংঘাত বেড়েছে এমন প্রমাণ মেলে না।
সমাধানের পথ কতটা কঠিন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মধ্যে সংঘাত পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়। তবে তা কমানোর উপায় রয়েছে। কৃষিকাজের সময়সূচি সমন্বয়, বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয়দের সংরক্ষণ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা—এসব উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে হাতি প্রতিরোধী বেড়াও ব্যবহার করা যায়, যদিও তা রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়বহুল। পাশাপাশি স্থানীয়দের জীবিকা উন্নয়নে সহায়তা করলে তারা সংরক্ষণে আগ্রহী হতে পারেন।
ভয়ের ছায়ায় একটি পরিবার
তবে এসব পরিকল্পনা বান্দার পরিবারের জন্য খুব একটা সান্ত্বনা নয়। তার মেয়ে বিয়াট্রিস এখনও দুঃস্বপ্নে ভোগে। কোনো প্রাণী কাছে এলেই সে আতঙ্কে কেঁপে ওঠে। এই একটি ঘটনা যেন পুরো অঞ্চলের মানুষের ভয়ের প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















