০৮:৩৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬
যুদ্ধ গাজার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে সহজ ও আধ্যাত্মিক জীবনের পথে এক গ্রাম টোকিওর পথে পুরোনো প্রেম, না কি নতুন শুরু? সম্পর্কের জটিলতায় ভরপুর এক ভিন্নধর্মী প্রেমকাহিনি অতিরিক্ত উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য: সাফল্যের সোপান নাকি বিপর্যয়ের সূচনা? পর্যটনেই ভর করে বদলে যাবে গ্রেট নিকোবর: বিশাল উন্নয়ন পরিকল্পনায় নতুন অর্থনীতির স্বপ্ন পাঞ্জাবে নতুন ধারার চার্চে ভিড়, বিশ্বাস নাকি বিতর্ক—ধর্মান্তর আইন ঘিরে বাড়ছে উত্তাপ লুকিয়ে থাকা থেকে আশার পথে: বস্তারে মাওবাদী প্রভাব কমার পেছনের বাস্তব চিত্র ব্রিটেনে সহায়ক মৃত্যুর আইন থমকে: জনসমর্থন থাকলেও সংসদে কেন আটকে গেল বিতর্কিত বিল চীনের ছোট শহরে বার্গারের দখল: নতুন বাজারে ঝুঁকি নিয়েও এগোচ্ছে বহুজাতিক ফাস্টফুড জায়ান্ট চীন কি গোপনে ইরানকে ক্ষেপণাস্ত্র দিচ্ছে? মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে নতুন আশঙ্কা

সহজ ও আধ্যাত্মিক জীবনের পথে এক গ্রাম

অন্ধ্র প্রদেশের হিরামান্ডালামের মনোরম পাহাড়ে ঘেরা কুর্মা গ্রামম একটি ছোট্ট গ্রাম, যেখানে ৬০ একর জায়গাজুড়ে বসবাস করে মাত্র ১৭টি পরিবার। আধুনিক জীবনযাত্রা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এই গ্রাম এক ভিন্ন বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরে—যেখানে সরলতা ও আধ্যাত্মিকতাই জীবনের মূল ভিত্তি।

গ্রামের বাসিন্দারা বিশ্বাস করেন, আধুনিক সমাজের অনেক সমস্যার সমাধান রয়েছে ঐতিহ্যবাহী ও সরল জীবনধারায়। এখানে নেই ব্যয়বহুল শিক্ষা, অপরাধ, অসুস্থতা, হাসপাতাল, আদালত, পুলিশ স্টেশন কিংবা বৃদ্ধাশ্রম।

ভোরের শুরু আচার-অনুষ্ঠানে
সূর্য ওঠার অনেক আগেই, ভোর সাড়ে তিনটার দিকে, গ্রামের বাসিন্দারা জেগে ওঠেন। কাঁচা মাটির ঘরে জ্বালানো প্রদীপই তাদের আলোর একমাত্র উৎস, কারণ গ্রামে বিদ্যুৎ নেই। দিনের শুরু হয় ঘর পরিষ্কার করা, স্নান এবং তারপর প্রার্থনার জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার মধ্য দিয়ে।

সাড়ে চারটার দিকে সবাই লণ্ঠন হাতে প্রার্থনালয়ে জড়ো হন। সেখানে পুরুষ ও নারীরা আলাদা বসে শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশ্যে মন্ত্রপাঠ করেন। ভক্তিভরে গীতা ও ভাগবতের পাঠ চলে প্রায় এক ঘণ্টা। প্রার্থনা শেষে গ্রামের প্রধান সেদিনের পঞ্চাঙ্গ পড়ে শোনান।

গ্রামের পরিচয় ও বিস্তার
শ্রীকাকুলম জেলা থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে এবং শ্রী মুখলিংগম মন্দিরের কাছাকাছি অবস্থিত এই গ্রাম ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ভক্ত বিকাশ স্বামীর নির্দেশনায়। উদ্দেশ্য ছিল একটি সরল ও আধ্যাত্মিক জীবনভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা।

প্রথমে মাত্র দুটি পরিবার দিয়ে শুরু হলেও এখন এখানে প্রায় ৮৫ জন বাসিন্দা রয়েছে, যারা ওডিশা, অন্ধ্র প্রদেশ, তেলেঙ্গানা ও মহারাষ্ট্র থেকে এসেছেন।

The simple, spiritual living in Andhra's Kurma Gramam village - The Hindu

আধুনিকতা ছাড়াই জীবনযাপন
এই গ্রামে নেই বিদ্যুৎ, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট বা গ্যাস সংযোগ। বাসিন্দারা সম্পূর্ণ ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে জীবনযাপন করেন। মাটির ঘর, কাঠের ছাদ, কুয়া থেকে পানি—সবই তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।

প্রতিটি বাড়ির মাঝখানে একটি ছোট খোলা কুয়া থাকে। ঘরগুলো নির্দিষ্টভাবে ভাগ করা—একটি প্রার্থনার জন্য, একটি রান্নাঘর, আরেকটি ফসল সংরক্ষণের জন্য। বাড়ির পেছনে ছোট জমিতে তারা সবজি ও ফুল চাষ করেন।

রান্না হয় জ্বালানি কাঠে, আর খাওয়ার জন্য মেঝেতে উঁচু আসনে বসে খাবার পরিবেশন করা হয়। বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও তারা পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি অনুসরণ করেন, যা পরে সার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

নীরব ও যানবাহনমুক্ত পরিবেশ
গ্রামে যানবাহন প্রবেশ নিষিদ্ধ, ফলে পরিবেশ শান্ত ও নিরিবিলি। পোশাকেও কঠোর ঐতিহ্য অনুসরণ করা হয়—পুরুষরা ধুতি-কুর্তা এবং নারীরা শাড়ি পরেন, যা গ্রামের তাঁতেই তৈরি।

শিক্ষা ও কর্মসংস্কৃতি
গ্রামে একটি ছোট গুরুকুল রয়েছে, যেখানে শিশুদের বৈদিক জ্ঞান, সংস্কৃত ও তেলুগু শেখানো হয়। এখানে প্রচলিত পাঠ্যক্রম নেই। শিশুদের ১৩-১৪ বছর পর্যন্ত পড়ানো হয়, এরপর তাদের আগ্রহ ও দক্ষতা অনুযায়ী কাজ বেছে নিতে উৎসাহ দেওয়া হয়।

হায়দরাবাদের একজন প্রকৌশলী শ্রীকান্ত এখানে এসে শিক্ষকতা করছেন। তিনি বলেন, “এখানে আমরা শিশুদের উপর কোনো চাপ দিই না। তারা অর্থ উপার্জনের যন্ত্র নয়। জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতাই যথেষ্ট।”

খাদ্যাভ্যাসে ঐতিহ্যের ছোঁয়া
গ্রামের খাদ্যাভ্যাসও ব্যতিক্রমী। সকালে ভেজানো ও টক করা ভাত খাওয়া হয়, এরপর দুপুরে পূর্ণ ভাতের খাবার, আর বিকেলে হালকা খাবার। সূর্যাস্তের পর কঠিন খাবার গ্রহণ করা হয় না।

Vedic: In IT hub Andhra, this village lives the Vedic way | India News -  Times of India

শান্ত জীবনের খোঁজে আগমন
অনেকে আধ্যাত্মিক শান্তির খোঁজে এখানে বসবাস শুরু করেছেন। নন্দনন্দন দাস নামের এক বাসিন্দা বলেন, “এখানে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে পারি। জীবনের চাপ নেই।”

তার মেয়ে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত নয়, এমনকি মোবাইল ফোন সম্পর্কে তার ধারণাও সীমিত।

পর্যটকদের আকর্ষণ
এই গ্রাম বছরে অনেক দর্শনার্থীকে আকর্ষণ করে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০ জন এবং ছুটির দিনে ৫০০ জনের বেশি মানুষ এখানে আসেন। তারা দান করেন, আধ্যাত্মিক বই কেনেন এবং অনেকেই কয়েকদিন থেকে এই জীবনধারা অনুভব করেন।

গ্রামে প্লাস্টিক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এক দর্শনার্থী বলেন, “এখানে এসে মনে হয় অন্য এক জগতে প্রবেশ করেছি। আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়া মানুষ কীভাবে এত শান্তিতে থাকতে পারে, তা সত্যিই বিস্ময়কর।”

সূত্র দি হিন্দু

জনপ্রিয় সংবাদ

যুদ্ধ গাজার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে

সহজ ও আধ্যাত্মিক জীবনের পথে এক গ্রাম

০৭:০০:২৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

অন্ধ্র প্রদেশের হিরামান্ডালামের মনোরম পাহাড়ে ঘেরা কুর্মা গ্রামম একটি ছোট্ট গ্রাম, যেখানে ৬০ একর জায়গাজুড়ে বসবাস করে মাত্র ১৭টি পরিবার। আধুনিক জীবনযাত্রা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এই গ্রাম এক ভিন্ন বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরে—যেখানে সরলতা ও আধ্যাত্মিকতাই জীবনের মূল ভিত্তি।

গ্রামের বাসিন্দারা বিশ্বাস করেন, আধুনিক সমাজের অনেক সমস্যার সমাধান রয়েছে ঐতিহ্যবাহী ও সরল জীবনধারায়। এখানে নেই ব্যয়বহুল শিক্ষা, অপরাধ, অসুস্থতা, হাসপাতাল, আদালত, পুলিশ স্টেশন কিংবা বৃদ্ধাশ্রম।

ভোরের শুরু আচার-অনুষ্ঠানে
সূর্য ওঠার অনেক আগেই, ভোর সাড়ে তিনটার দিকে, গ্রামের বাসিন্দারা জেগে ওঠেন। কাঁচা মাটির ঘরে জ্বালানো প্রদীপই তাদের আলোর একমাত্র উৎস, কারণ গ্রামে বিদ্যুৎ নেই। দিনের শুরু হয় ঘর পরিষ্কার করা, স্নান এবং তারপর প্রার্থনার জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার মধ্য দিয়ে।

সাড়ে চারটার দিকে সবাই লণ্ঠন হাতে প্রার্থনালয়ে জড়ো হন। সেখানে পুরুষ ও নারীরা আলাদা বসে শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশ্যে মন্ত্রপাঠ করেন। ভক্তিভরে গীতা ও ভাগবতের পাঠ চলে প্রায় এক ঘণ্টা। প্রার্থনা শেষে গ্রামের প্রধান সেদিনের পঞ্চাঙ্গ পড়ে শোনান।

গ্রামের পরিচয় ও বিস্তার
শ্রীকাকুলম জেলা থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে এবং শ্রী মুখলিংগম মন্দিরের কাছাকাছি অবস্থিত এই গ্রাম ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ভক্ত বিকাশ স্বামীর নির্দেশনায়। উদ্দেশ্য ছিল একটি সরল ও আধ্যাত্মিক জীবনভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা।

প্রথমে মাত্র দুটি পরিবার দিয়ে শুরু হলেও এখন এখানে প্রায় ৮৫ জন বাসিন্দা রয়েছে, যারা ওডিশা, অন্ধ্র প্রদেশ, তেলেঙ্গানা ও মহারাষ্ট্র থেকে এসেছেন।

The simple, spiritual living in Andhra's Kurma Gramam village - The Hindu

আধুনিকতা ছাড়াই জীবনযাপন
এই গ্রামে নেই বিদ্যুৎ, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট বা গ্যাস সংযোগ। বাসিন্দারা সম্পূর্ণ ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে জীবনযাপন করেন। মাটির ঘর, কাঠের ছাদ, কুয়া থেকে পানি—সবই তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।

প্রতিটি বাড়ির মাঝখানে একটি ছোট খোলা কুয়া থাকে। ঘরগুলো নির্দিষ্টভাবে ভাগ করা—একটি প্রার্থনার জন্য, একটি রান্নাঘর, আরেকটি ফসল সংরক্ষণের জন্য। বাড়ির পেছনে ছোট জমিতে তারা সবজি ও ফুল চাষ করেন।

রান্না হয় জ্বালানি কাঠে, আর খাওয়ার জন্য মেঝেতে উঁচু আসনে বসে খাবার পরিবেশন করা হয়। বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও তারা পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি অনুসরণ করেন, যা পরে সার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

নীরব ও যানবাহনমুক্ত পরিবেশ
গ্রামে যানবাহন প্রবেশ নিষিদ্ধ, ফলে পরিবেশ শান্ত ও নিরিবিলি। পোশাকেও কঠোর ঐতিহ্য অনুসরণ করা হয়—পুরুষরা ধুতি-কুর্তা এবং নারীরা শাড়ি পরেন, যা গ্রামের তাঁতেই তৈরি।

শিক্ষা ও কর্মসংস্কৃতি
গ্রামে একটি ছোট গুরুকুল রয়েছে, যেখানে শিশুদের বৈদিক জ্ঞান, সংস্কৃত ও তেলুগু শেখানো হয়। এখানে প্রচলিত পাঠ্যক্রম নেই। শিশুদের ১৩-১৪ বছর পর্যন্ত পড়ানো হয়, এরপর তাদের আগ্রহ ও দক্ষতা অনুযায়ী কাজ বেছে নিতে উৎসাহ দেওয়া হয়।

হায়দরাবাদের একজন প্রকৌশলী শ্রীকান্ত এখানে এসে শিক্ষকতা করছেন। তিনি বলেন, “এখানে আমরা শিশুদের উপর কোনো চাপ দিই না। তারা অর্থ উপার্জনের যন্ত্র নয়। জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতাই যথেষ্ট।”

খাদ্যাভ্যাসে ঐতিহ্যের ছোঁয়া
গ্রামের খাদ্যাভ্যাসও ব্যতিক্রমী। সকালে ভেজানো ও টক করা ভাত খাওয়া হয়, এরপর দুপুরে পূর্ণ ভাতের খাবার, আর বিকেলে হালকা খাবার। সূর্যাস্তের পর কঠিন খাবার গ্রহণ করা হয় না।

Vedic: In IT hub Andhra, this village lives the Vedic way | India News -  Times of India

শান্ত জীবনের খোঁজে আগমন
অনেকে আধ্যাত্মিক শান্তির খোঁজে এখানে বসবাস শুরু করেছেন। নন্দনন্দন দাস নামের এক বাসিন্দা বলেন, “এখানে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে পারি। জীবনের চাপ নেই।”

তার মেয়ে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত নয়, এমনকি মোবাইল ফোন সম্পর্কে তার ধারণাও সীমিত।

পর্যটকদের আকর্ষণ
এই গ্রাম বছরে অনেক দর্শনার্থীকে আকর্ষণ করে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০ জন এবং ছুটির দিনে ৫০০ জনের বেশি মানুষ এখানে আসেন। তারা দান করেন, আধ্যাত্মিক বই কেনেন এবং অনেকেই কয়েকদিন থেকে এই জীবনধারা অনুভব করেন।

গ্রামে প্লাস্টিক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এক দর্শনার্থী বলেন, “এখানে এসে মনে হয় অন্য এক জগতে প্রবেশ করেছি। আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়া মানুষ কীভাবে এত শান্তিতে থাকতে পারে, তা সত্যিই বিস্ময়কর।”

সূত্র দি হিন্দু