মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আঁচ এসে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে। জ্বালানির দাম হু হু করে বাড়ছে, আর সেই চাপ গিয়ে পড়ছে মুদিখানার বাজার থেকে শুরু করে বিমানের টিকিট পর্যন্ত সবকিছুতে। বাজারে গিয়ে চেনা পণ্য কিনলেও বিল আসছে আগের চেয়ে অনেক বেশি। সপ্তাহ শেষে পকেট প্রায় খালি। এই পরিস্থিতিতে দেশটির অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতি আরও জটিল হলে মন্দার দিকে পা বাড়াতে পারে আমেরিকা।
বাজারে গেলেই বাড়তি খরচ
পোর্টল্যান্ড শহরে বাস করেন অ্যাঞ্জি হাওয়ার্ড। বাড়ি থেকেই কাজ করেন বলে গাড়িতে তেল খরচ হয় না তার। তবু তিনি টের পাচ্ছেন চারদিকে দাম বাড়ার চাপ। বাজারে গিয়ে চেনা জিনিস কিনলেই বিল আসছে আগের চেয়ে বিশ থেকে ত্রিশ ডলার বেশি। ডেলিভারিতেও যুক্ত হচ্ছে বাড়তি জ্বালানি চার্জ। সপ্তাহ শেষে হাতে যে কটা পয়সা থাকত, তা-ও এখন থাকছে না। হাওয়াইয়ের বিমান টিকিটের দাম দ্বিগুণের বেশি হয়ে গেছে, তাই সেই পরিকল্পনা বাতিল করে দিয়েছেন তিনি।

অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিতেই চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনের দুই-তৃতীয়াংশ আসে ভোক্তাদের ব্যয় থেকে। গত পাঁচ বছরে মূল্যস্ফীতি, সুদের হারের চাপ আর শুল্কের ঝড় সামলেও দেশটির ভোক্তারা অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বাড়ায় এবার তাদের ওপর চাপ আরও বেড়েছে। সঞ্চয়ের হার নেমে এসেছে ২০০৮ সালের পর সর্বনিম্নে। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভোক্তা জরিপে আস্থার সূচক রেকর্ড পতন দেখিয়েছে।
জেপি মর্গান প্রাইভেট ব্যাংকের অর্থনীতিবিদ জো সাইডল বলেছেন, প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা নেতিবাচকে নেমে গেলে দেশ মন্দার দিকে চলে যাবে। উচ্চ জ্বালানির দাম কার্যত একটি পরোক্ষ করের মতো কাজ করে — মানুষের হাতে খরচ করার মতো অর্থ কমিয়ে দেয়।
বিনিয়োগকারীদের সম্পদে ধাক্কা লাগলে কী হবে?
জ্বালানির দামের পাশাপাশি আরেকটি ঝুঁকি হলো শেয়ারবাজার। উচ্চ আয়ের মানুষেরা বিনিয়োগ পোর্টফোলিওর মূল্যবৃদ্ধিতে উৎসাহিত হয়ে বেশি খরচ করেন। এই পরিস্থিতি উল্টে গেলে খরচ হঠাৎ কমে যেতে পারে। ব্যাংক অব আমেরিকার অর্থনীতিবিদ শ্রুতি মিশ্র বলেছেন, তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার এবং শেয়ারবাজারে ২০ শতাংশ পতন — এই দুটি সীমা টেকসইভাবে অতিক্রান্ত হলে ভোক্তা ব্যয়ে বড় ধাক্কা লাগবে।
তবে এখন পর্যন্ত বাজারের তথ্য পুরোপুরি নেতিবাচক নয়। গত বছর পাস হওয়া আইনের সুবাদে করফেরত বেশি পেয়েছেন অনেকে। গত এক বছরে মূল শেয়ারসূচক প্রায় ২৪ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া গত পাঁচ বছরে বাড়ির দাম ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে, যা মানুষকে আর্থিকভাবে স্থিতিশীল অনুভব করাচ্ছে।
কাজ হারানো মানুষের কষ্ট আরও বেশি
ডেনভারের কাছে সরকারি চাকরি হারিয়ে এখন স্নাতক পড়ছেন ডাকোটা ওয়াইল্ড। সীমিত সঞ্চয়ে সংসার চালাচ্ছেন। জ্বালানির দাম বাড়ায় কস্টকোতে গিয়ে পণ্য কেনাও এখন হিসাব করতে হচ্ছে — গাড়ি নিয়ে গেলে যে তেল খরচ হবে, তা বাঁচানো পণ্যের চেয়ে বেশি কিনা সেটাই প্রশ্ন। স্ট্রিমিং সাবস্ক্রিপশন বাদ দিয়েছেন, অপ্রয়োজনীয় খরচ প্রায় শূন্যে নামিয়েছেন। তবু চাপ কমছে না।
অর্থনীতি এখনো ভাসছে, কিন্তু কতদিন?
মিনিয়াপোলিসের কুরিয়ার টিম উলফের মতো মানুষরা এখনো অর্থনীতিকে চাঙা রাখছেন। হাইব্রিড গাড়িতে তেল কম লাগে, বাড়ির দাম বেড়েছে, তাই এখনো ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা ধরে রেখেছেন। তবে ভ্যানগার্ডের অর্থনীতিবিদ জশ হার্ট সতর্ক করেছেন, যদি কোম্পানিগুলো কর্মী ছাঁটাই শুরু করে এবং বেকারত্ব বাড়ে, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যাবে। সেই পরিস্থিতি এখনো আসেনি, তবে যুদ্ধ যদি আরও ছড়িয়ে পড়ে, সেটাই হবে সবচেয়ে বড় শঙ্কা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















