মার্চের শেষ দিকে, মিয়ামিতে এক সৌদি বিনিয়োগ সম্মেলনের মঞ্চে বসেছিলেন জ্যারেড কুশনার। তখন ইরান যুদ্ধের ২৬তম দিন চলছিল। তাকে সেখানে ডাকা হয়েছিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনানুষ্ঠানিক দূত হিসেবে নয়, বরং তার বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান অ্যাফিনিটি পার্টনার্সের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী হিসেবে। সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের ব্যক্তিগত থিঙ্ক ট্যাঙ্কের মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এসেছে। একই সময়ে, খবর ছিল যে প্রিন্স মোহাম্মদ ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চাচ্ছেন, আর কুশনার আরও বিনিয়োগ তোলার চেষ্টা করছেন।
সঞ্চালক জানতে চাইলেন, “শান্তির চুক্তিকারী” হিসেবে তিনি কী শিখেছেন।
কুশনার বললেন, শান্তি আর ব্যবসার মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য নেই। দুটোই ধাঁধার মতো, আর তিনি প্রতিটি চ্যালেঞ্জকে সেইভাবে দেখেন।
এই কথোপকথন ছিল বিস্ময়কর। একদিকে তেহরানে বোমা পড়ছে, হরমুজ প্রণালীতে মাইন পাতা হচ্ছে, আর অন্যদিকে বিনিয়োগ সম্মেলনের মঞ্চে শান্তিকে ব্যবসার মতো করে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। যুদ্ধের আগে কয়েক সপ্তাহে কুশনার ও তার সহযোগী স্টিভ উইটকফ ইরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারায় পরিস্থিতি দ্রুত বিপর্যয়ের দিকে যায়। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় হাজারের বেশি ইরানি বেসামরিক মানুষ নিহত হন, লেবাননে হামলা বাড়ে এবং সংঘাত পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
ট্রাম্পের কূটনৈতিক ধরণ
কুশনার ও উইটকফ ট্রাম্পের কূটনৈতিক মানসিকতার প্রতিনিধিত্ব করেন। এই কৌশল অনেকটা নাটকীয় ও বাহুল্যপূর্ণ, যা ট্রাম্পের রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়িক চিন্তার প্রতিফলন। কিন্তু ইরান প্রসঙ্গে এই কৌশল ব্যর্থ হয়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে তাদের সামনে সুযোগ ছিল ইরানের সঙ্গে একটি নতুন পারমাণবিক চুক্তি করার, যা যুদ্ধ ঠেকাতে পারত। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগানো হয়নি।
পরে দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতি হলেও তা কুশনার বা উইটকফের উদ্যোগে নয়, বরং পাকিস্তান ও চীনের জরুরি কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় সম্ভব হয়। পরবর্তী আলোচনায় ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স নেতৃত্ব দেন, আর কুশনার ও উইটকফের ভূমিকা কমে যায়।

অভিজ্ঞতার অভাব ও ব্যর্থতা
কুশনার মূলত রাজনীতির মুখ হতে চাননি, কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনে পারিবারিক প্রভাবের কারণে তাকে আবার আলোচনায় ডাকা হয়। তিনি ও উইটকফ ইউক্রেন, গাজা থেকে শুরু করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে যুক্ত হন।
শুরুতে কিছু সাফল্য এলেও, ইরান প্রসঙ্গে তাদের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফেব্রুয়ারিতে জেনেভায় আলোচনায় তারা অংশ নেন, যেখানে অভিজ্ঞ ইরানি আলোচকরা উপস্থিত ছিলেন। ইরান একটি সাত পৃষ্ঠার প্রস্তাব দেয়, যা অনেক বিশেষজ্ঞের মতে ইতিবাচক ছিল। কিন্তু কুশনার ও উইটকফ তা পুরোপুরি বুঝতে পারেননি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার রাখতে চাইলেও অন্যান্য বিষয়ে আলোচনার জন্য প্রস্তুত ছিল। দক্ষ আলোচকের কাছে এটি বড় সুযোগ হতে পারত। কিন্তু কুশনার ও উইটকফ এটিকে হুমকি হিসেবে দেখেন।
পরিস্থিতির অবনতি
আলোচনার দুই দিন পরই ইরানে হামলা শুরু হয়। এতে ইরানের সঙ্গে বিশ্বাস পুরোপুরি ভেঙে যায়। এটি দ্বিতীয়বারের মতো আলোচনা ভেঙে যুদ্ধের দিকে নিয়ে যায়।
এই সময়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে হামলার পক্ষে চাপ দিচ্ছিলেন।
ব্যবসা ও কূটনীতির সংঘাত
কুশনারের কূটনৈতিক কাজের পাশাপাশি তার ব্যবসায়িক সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তিনি বিদেশি সরকারের সঙ্গে যুক্ত বিনিয়োগ নিচ্ছেন, আবার একই সময়ে কূটনৈতিক আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন।
উইটকফও মূলত রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তার অভিজ্ঞতা কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কূটনীতি শুধু চুক্তি করার দক্ষতা নয়, এর জন্য গভীর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দলগত কাজ প্রয়োজন।
ওবামা প্রশাসনের সঙ্গে তুলনা
২০১৫ সালের ইরান চুক্তি ছিল দীর্ঘ ও জটিল আলোচনার ফল, যেখানে অভিজ্ঞ কূটনীতিক, প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদাররা যুক্ত ছিলেন। সেই তুলনায় বর্তমান প্রচেষ্টা অনেকটাই দুর্বল ও অপরিকল্পিত।
বর্তমানে জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল ও পররাষ্ট্র দপ্তরের ভূমিকা কমে যাওয়ায় কূটনৈতিক দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রভাব
হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগে। জ্বালানির দাম বাড়ে, ব্যবসায় ব্যয় বেড়ে যায় এবং অর্থপ্রবাহ ব্যাহত হয়।
শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াল
ইসলামাবাদে সাম্প্রতিক আলোচনা কোনো বড় অগ্রগতি আনতে পারেনি। দীর্ঘ আলোচনার পরও ইরান যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। যদিও দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বৈঠক হয়েছে, যা ১৯৭৯ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ।
তবে দ্রুত সাফল্যের আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণের কারণে ইরান এখন শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
সব মিলিয়ে, কূটনীতিকে যদি সত্যিই ব্যবসার মতো চালানো হতো, তবে হয়তো ভিন্ন ফল আসত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি যেন একটি ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগ, যার ফলাফল সবার ওপরই প্রভাব ফেলছে।
জনাথন গাইয়ার 



















