মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ঘিরে অনিশ্চয়তার মধ্যে চীনের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য মেলা ক্যান্টন ফেয়ার নতুন রেকর্ড গড়লেও রপ্তানি খাতে চাপ বাড়ার আশঙ্কা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব ইতোমধ্যেই চীনের বাণিজ্য পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হতে শুরু করেছে।
মেলার পরিবেশে উদ্বেগ ও হিসাব-নিকাশ
চীনের উৎপাদনকেন্দ্র গুয়াংজুতে বুধবার শুরু হওয়া এই মেলায় দেশীয় রপ্তানিকারক ও বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা চলছে। সবাই বোঝার চেষ্টা করছেন, চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বিশ্ব বাণিজ্যে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতির সম্ভাব্য চাপ এখনও ব্যবসায়ীদের মনে উদ্বেগ তৈরি করে রেখেছে। গত কয়েক বছরে অনেক চীনা রপ্তানিকারক যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপ ও উদীয়মান বাজারে ঝুঁকেছেন। এসব বাজার কিছুটা সহায়তাও দিয়েছে। তবে নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা সেই ভরসাকেও অনিশ্চিত করে তুলছে।
নতুন ঝুঁকিতে রপ্তানি বাজার

রপ্তানিকারকদের মতে, বিমান চলাচল বিঘ্নিত হওয়া, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং পরিবহন জটিলতা নতুন করে ঝুঁকি তৈরি করছে। যেসব বাজারে তারা নির্ভরতা বাড়িয়েছিলেন, সেগুলোও এখন চাপের মুখে পড়ছে।
রেকর্ড সংখ্যায় অংশগ্রহণ, তবু শঙ্কা
তিন সপ্তাহব্যাপী ক্যান্টন ফেয়ার, যা আনুষ্ঠানিকভাবে চীন আমদানি-রপ্তানি মেলা নামে পরিচিত, দেশটির রপ্তানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত। এবারের মেলায় ১৫ লাখ ৫০ হাজার বর্গমিটার প্রদর্শনী এলাকা, ৭৫ হাজার ৭০০টি স্টল এবং ৩২ হাজারের বেশি কোম্পানি অংশ নিয়েছে—যা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। নতুন অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৯০০টি।
ভ্রমণ ব্যয় ও সরবরাহে বিঘ্ন
গুয়াংডং প্রদেশের ঝংশান শহরের আলো পণ্যের রপ্তানিকারক জেসন তান বলেন, মধ্যপ্রাচ্য হয়ে যাতায়াতের ফ্লাইট কমে যাওয়া এবং ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ইউরোপ ও এশিয়ার কিছু অঞ্চলের ক্রেতারাও সমস্যায় পড়ছেন। এতে মেলায় অংশগ্রহণ কমতে পারে।
উৎপাদন খরচে বড় ধাক্কা

তানের মতে, কাঁচামালের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পলিকার্বনেটের দাম ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ এবং এবিএস প্লাস্টিকের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। ফলে মোট উৎপাদন খরচ ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
তবে এই বাড়তি খরচ ক্রেতাদের ওপর চাপানো সহজ হচ্ছে না। বড় ক্রেতারা সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধি মেনে নিচ্ছেন। এর বেশি হলে তারা অর্ডার দিতে দেরি করছেন বা স্থগিত রাখছেন।
ইউরোপীয় বাজারেও মন্দা
তান জানান, ইউরোপে এক মাস কাটিয়ে তিনি দেখেছেন, সেখানে পণ্যের মজুত বেশি, কিন্তু বিক্রি ধীরগতির। ফলে আগে যেভাবে ইউরোপকে বড় ভরসা মনে করা হতো, সেটিও এখন দুর্বল হয়ে পড়ছে।
অর্ডার কমার আশঙ্কা
ঝেজিয়াং প্রদেশের গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি রপ্তানিকারক উ শেং বলেন, ক্রেতারা নতুন পণ্য দেখতে আসলেও অর্ডারের পরিমাণ কমবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কেউই ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।
মধ্যপ্রাচ্যের বাজারেও ধাক্কা

ইউউ ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শু ইয়ান জানান, গত এক মাসে মধ্যপ্রাচ্যের বাজার থেকে অনেক ব্যবসায়ীর অর্ডার গত বছরের একই সময়ের তুলনায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। পরিস্থিতি কী দিকে যায়, তা দেখার জন্য সবাই অপেক্ষা করছেন।
বাণিজ্য পরিসংখ্যানে যুদ্ধের প্রভাব
সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক তথ্য বলছে, মার্চ মাসে চীনের রপ্তানি মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে, যা প্রত্যাশার চেয়ে কম। অন্যদিকে আমদানি বেড়েছে ২৭ দশমিক ৮ শতাংশ, যা ২০২১ সালের পর সবচেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি। মূলত জ্বালানি ও পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণেই এই প্রবণতা দেখা গেছে।
সব খাতে সমান প্রভাব নয়
তবে সব খাত সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। নতুন জ্বালানি নির্ভর কৃষিযন্ত্র রপ্তানিকারক ইয়ান ওয়েই বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের ক্রেতা বাড়তে পারে, কিন্তু অর্ডারের ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত। তামা ও লোহাসহ কাঁচামালের দাম বাড়ায় তাদের খরচ প্রায় ৫ শতাংশ বেড়েছে, ফলে পণ্যের দামও বাড়াতে হবে।
তিনি আরও জানান, ইউরোপে এখনো অর্ডার মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে, কারণ সেখানে মজুত কম। একই সঙ্গে তেলের উচ্চমূল্য নতুন জ্বালানিচালিত কৃষিযন্ত্রের চাহিদা বাড়াতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















