চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে চীনের অর্থনীতি কাগজে-কলমে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখালেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক জটিল ও অসম চিত্র। একদিকে অবকাঠামো খাতে জোরালো বিনিয়োগ অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে, অন্যদিকে ভোক্তা ব্যয়ের দুর্বলতা ও আবাসন খাতের ধস পুরো চিত্রকে ভারসাম্যহীন করে তুলছে।
প্রথম প্রান্তিকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ তিন মাসের তুলনায় অর্থনীতি ১.৩ শতাংশ বেড়েছে। আর আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৫ শতাংশে, যা প্রত্যাশার চেয়েও কিছুটা বেশি। তবে এই বৃদ্ধির পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো আগের বছরের প্রথমার্ধের দুর্বল তথ্য পুনর্মূল্যায়ন, যা বর্তমান ফলাফলকে তুলনামূলকভাবে ভালো দেখাচ্ছে।
অবকাঠামোই প্রধান ভরসা
চীনের অর্থনীতির এই প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে অবকাঠামো খাত। রেললাইনসহ বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ৮.৯ শতাংশ। সরকার-নির্ভর এই বিনিয়োগই অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখছে, যখন অন্যান্য খাত দুর্বল হয়ে পড়ছে।

ভোক্তা ব্যয়ে মন্দা
অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ চাহিদা স্পষ্টভাবে দুর্বল। খুচরা বিক্রি মাত্র ২.৪ শতাংশ বেড়েছে, যা অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক। মার্চ মাসে এই হার আরও কমে ১.৭ শতাংশে নেমে আসে। গাড়ি বিক্রিও ১৭ শতাংশ কমে গেছে, কারণ সরকার আগের মতো ভর্তুকি দিচ্ছে না।
এই পরিস্থিতির বড় কারণ আবাসন বাজারের দীর্ঘমেয়াদি সংকট। ফ্ল্যাটের দাম ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকায় মানুষের সঞ্চয় কমেছে, ফলে খরচ কমিয়ে দিচ্ছে সাধারণ পরিবারগুলো।
রপ্তানিতে সাময়িক স্বস্তি
চীনের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে রপ্তানি এখনও বড় ভূমিকা রাখছে। বছরের প্রথম তিন মাসে রপ্তানি চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত হারে বেড়েছে। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক গাড়ি রপ্তানি ৭৮ শতাংশ এবং লিথিয়াম ব্যাটারি ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে এই প্রবণতা কতদিন স্থায়ী হবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং শুল্কের চাপ ভবিষ্যতে রপ্তানিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

সেমিকন্ডাক্টর আমদানির চাপ
এই সময়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো সেমিকন্ডাক্টর আমদানির হঠাৎ বৃদ্ধি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা সেন্টার নির্মাণের কারণে চিপের চাহিদা বেড়েছে। মার্চে এই আমদানি আগের বছরের তুলনায় ৫৪ শতাংশ বেড়েছে।
তবে দুর্বল মুদ্রার কারণে এই আমদানি আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে, যা অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।
আবাসন খাতে গভীর সংকট
চীনের আবাসন খাত এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা। গত এক বছরে অনেক এলাকায় ফ্ল্যাটের দাম অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। এত কম দামেও ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না, কারণ বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা মানুষের আস্থা কমিয়ে দিয়েছে।
ফলে নির্মাণকাজ কমে গেলেও বিক্রি আরও দ্রুত হারে কমছে, যা পুরো খাতকে গভীর সংকটে ঠেলে দিয়েছে।

ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, চীনের অর্থনীতি আপাতদৃষ্টিতে এগোলেও এর ভিত নড়বড়ে। অবকাঠামো বিনিয়োগ ও রপ্তানি সাময়িক স্বস্তি দিলেও, অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও আবাসন সংকট বড় ঝুঁকি হয়ে রয়ে গেছে। এই ভারসাম্যহীনতা দীর্ঘমেয়াদে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















