চীনের অর্থনৈতিক কেন্দ্র সাংহাইয়ে এক অদ্ভুত বাস্তবতা সামনে এসেছে—একদিকে কর্মীর ঘাটতি, অন্যদিকে কাজ খুঁজতে হিমশিম খাচ্ছেন বয়স্ক মানুষরা। এই পরিস্থিতির মধ্যেই শহর কর্তৃপক্ষ নতুন পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে, যেখানে অবসরপ্রাপ্ত বা প্রবীণদের আবার কর্মক্ষেত্রে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
বয়স্কদের কাজ খোঁজার বাস্তবতা
৫৮ বছর বয়সী এক প্রাক্তন মেকানিকের মতো অনেকেই এখনও কাজ খুঁজছেন। গ্রামাঞ্চলে অবসর বয়স ৬০ হওয়ায় তিনি এখনও কর্মক্ষম হলেও শহরে কাজ পাওয়া সহজ হচ্ছে না। শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে গিয়ে তাকে উচ্চ ফি, অনিশ্চিত চাকরি এবং শারীরিকভাবে কষ্টকর কাজের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অনেক সংস্থা কাজ দেওয়ার আগেই মোটা অঙ্কের ফি নিচ্ছে, যা অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে।
কেন আবার কাজে ফিরছেন প্রবীণরা
পারিবারিক দায়িত্ব কিছুটা কমে যাওয়ার পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে সামাজিক নিরাপত্তা সীমিত হওয়ায় অনেক প্রবীণ নিজেদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে আবার কাজ খুঁজছেন। এই বাস্তবতা সরকারকেও নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে।
সরকারের নতুন উদ্যোগ
সাংহাইয়ের ২৮টি সরকারি দপ্তর যৌথভাবে একটি পরিকল্পনা নিয়েছে, যার লক্ষ্য প্রবীণদের জন্য উপযোগী চাকরি তৈরি করা। এতে বয়স্কদের উপযোগী কাজের সুযোগ বাড়ানো, বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, চিকিৎসক বা প্রযুক্তিবিদদের কাজে যুক্ত রাখা এবং প্রবীণদের জন্য আলাদা মানবসম্পদ সেবা গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।
জনসংখ্যা সংকটের চাপ
চীনে দ্রুত বয়স্ক জনসংখ্যা বাড়ছে। ২০২৫ সালের শেষে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩২ কোটি, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৩ শতাংশ। সাংহাইয়ে এই হার আরও বেশি—শহরের প্রায় ৩৭.৬ শতাংশ মানুষই ৬০ বছরের বেশি বয়সী।
এক সন্তান নীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং জন্মহার কমে যাওয়ার কারণে কর্মক্ষম জনসংখ্যা কমে যাচ্ছে। ফলে অর্থনীতি সচল রাখতে নতুন শ্রমশক্তির প্রয়োজন বাড়ছে।

অর্থনীতি ও শ্রমবাজারের ভারসাম্য
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্মক্ষম জনসংখ্যা ধরে রাখতে সরকার অবসর বয়স বাড়ানো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার বাড়ানো এবং প্রবীণদের কাজে ফিরিয়ে আনার মতো তিনটি পথ অনুসরণ করছে। তবে বয়স্কদের জন্য পর্যাপ্ত আইনি সুরক্ষা এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।
তরুণদের চাকরি নিয়ে উদ্বেগ
এই পরিকল্পনা নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, বয়স্করা কাজে ফিরলে তরুণদের চাকরির সুযোগ কমে যেতে পারে। বর্তমানে ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার দীর্ঘদিন ধরেই বেশি, যা প্রায় ১৬ শতাংশের কাছাকাছি।
তবে গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রবীণদের কর্মসংস্থান বাড়লে তরুণদের কর্মসংস্থানও কিছুটা বাড়তে পারে। অর্থাৎ দুই প্রজন্মের মধ্যে প্রতিযোগিতার বদলে সহযোগিতার সম্ভাবনাও রয়েছে।
নীতিগত ঘাটতি ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
যদিও সরকার প্রবীণদের কাজে ফেরাতে উৎসাহ দিচ্ছে, তবুও নীতিগত সহায়তা এখনও সীমিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, বেকার ভাতা, চাকরি ধরে রাখার ভর্তুকি বা দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি আরও শক্তিশালী করা দরকার।
একই সঙ্গে তরুণ ও প্রবীণ—দুই প্রজন্মের জন্যই সমান সুযোগ তৈরি করা জরুরি, যাতে শ্রমবাজারে ভারসাম্য বজায় থাকে।
পরিসংখ্যান কী বলছে
২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী, ৬০-৬৪ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রায় ৩৪ শতাংশ এবং ৬৫-৬৯ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রায় ২৭ শতাংশ এখনও কর্মরত। ৭০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যেও প্রায় ১২ শতাংশ মানুষ কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে জাপানে ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের প্রায় ২৫.৭ শতাংশ এখনও কর্মজীবনে সক্রিয়।
চীনের বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, জনসংখ্যা সংকট মোকাবিলায় প্রবীণদের কর্মক্ষেত্রে ফিরিয়ে আনা এখন আর বিকল্প নয়, বরং প্রয়োজনীয় কৌশল হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















