বাংলাদেশি সংগীতশিল্পী রুনা লায়লা শৈশবে আশা ভোঁসলের গান অনুকরণ করা এবং একটি রিয়েলিটি শোয়ের মাধ্যমে গড়ে ওঠা তাদের গভীর বন্ধুত্বের কথা স্মরণ করেছেন।
শৈশবের অনুপ্রেরণা
আমি যখন বড় হচ্ছিলাম—সিলেট ও করাচিতে—তখন প্রথম রেডিও এবং ৭৮ আরপিএম রেকর্ডের মাধ্যমে আশা জির গান শুনি। আমার বয়স তখন প্রায় ছয়, যখন আমি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে তালিম নেওয়া শুরু করি। সে সময় লতা দিদি (লতা মঙ্গেশকর) ছিলেন আমার বড় অনুপ্রেরণা। কিছুদিন পর যখন আশা জির গান শুনতে শুরু করি, তখন তার কণ্ঠে এক ধরনের সূক্ষ্মতা, ভোকাল অলঙ্করণ আর গায়কির ভঙ্গি আমাকে মুগ্ধ করত। আমি সেগুলো অনুকরণ করার চেষ্টা করতাম। তখন বিষয়গুলো কঠিন মনে হলেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনুশীলন করতাম। তার গান গাওয়ার এই চর্চাই ছিল আমার রিয়াজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বহুমুখী প্রতিভার বিস্ময়
আশা জির অসংখ্য গানের মধ্যে অনেকই আমার প্রিয়, তবে বিশেষ করে ‘ঝুমকা গিরা রে’ গানটি আমি খুব পছন্দ করতাম। তার বহুমুখী প্রতিভা ছিল অবিশ্বাস্য। নাচের গান, ক্লাব সং, দুঃখের গান, প্রেমের গান—সব ধরনের গানই তিনি সমান দক্ষতায় গেয়েছেন। এত বৈচিত্র্যময় গান গেয়ে একই মান ধরে রাখা সত্যিই বিস্ময়কর। তিনি লাখো মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছেন, আমিও তাদের একজন।

বন্ধুত্বের সূচনা
ভারতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমাদের সংক্ষিপ্ত দেখা হলেও, আসল বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে দুবাইয়ে ‘সুর ক্ষেত্র’ অনুষ্ঠানের বিচারক হিসেবে কাজ করার সময়। সেখানে আমরা একসঙ্গে গান গাইতাম, হাসতাম, গল্প করতাম। এতটাই মেতে থাকতাম যে শোর প্রযোজক আমাদের আলাদা করে বসাতে বাধ্য হন। পরে জানা যায়, আমাদের অতিরিক্ত হাসি-আড্ডার কারণেই সেটে শান্তি বজায় রাখতে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আশা জি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, আমাদের একসঙ্গে না বসালে তিনি শুটিং করবেন না। শেষ পর্যন্ত প্রযোজককে তার কথাই মানতে হয়।
সহজ-সরল মানুষ
আশা জির যে দিকটি আমাকে সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে গেছে, তা হলো তার বিনয়। এত বড় শিল্পী হয়েও তিনি কখনো নিজের গুরুত্ব দেখানোর চেষ্টা করেননি। তিনি ছিলেন খুবই সহজ, প্রাণবন্ত ও স্নেহশীল। আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও তিনি আমাকে মায়ের মতো স্নেহ করতেন। আমি যখনই শ্রদ্ধা জানাতে তার পায়ে হাত দিতে যেতাম, তিনি আমাকে তুলে বলতেন, “আপনি আমার বন্ধু, আপনিও একজন বড় শিল্পী—আমি আপনাকে এটা করতে দেব না।”

ভালোবাসার স্মৃতি
‘সুর ক্ষেত্র’ অনুষ্ঠানের সময় তিনি প্রায়ই নিজের হাতে রান্না করে সেটে নিয়ে আসতেন। তিনি জানতেন আমি চিংড়ি মাছ পছন্দ করি। একবার গভীর রাতে শুটিং থাকলেও তিনি ভোরে বাজারে গিয়ে টাটকা চিংড়ি কিনে আমার জন্য রান্না করেছিলেন। আরেকবার বিরিয়ানি এনেছিলেন। এমনকি একদিন আমাকে বাড়িতে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিজ হাতে সব রান্না করেছিলেন। খাওয়ার শেষে হঠাৎ মনে পড়ায় তিনি দ্রুত রান্নাঘরে গিয়ে মিষ্টি হিসেবে শাহী টুকরা তৈরি করেন। তার কাছে একটি পূর্ণাঙ্গ খাবার মানে সবকিছু থাকা—এটাই ছিল তার আন্তরিকতা।
অক্লান্ত পরিশ্রমী শিল্পী
তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও উদ্যমী মানুষ। আমরা বিচারক হিসেবে বসে ক্লান্ত হয়ে পড়লেও তিনি সবসময় চনমনে থাকতেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারের পরও তিনি নিয়মিত রিয়াজ করতেন এবং মঞ্চে ওঠার আগে কঠিন গান অনুশীলন করতেন। তিনি বলতেন, “আমি যদি এটা না করি, আমি বাঁচতে পারব না।” যেখানে লতা জি থেমে গিয়েছিলেন, সেখানে আশা জি থেমে থাকেননি—তিনি এগিয়ে গেছেন নিজের ছন্দে।

শেষ স্মৃতি
আমি তার জন্য একটি বাংলা গান তৈরি করেছিলাম। তাকে বোঝাতে গিয়ে আমি ভয়ে কাঁপছিলাম। কিন্তু তিনি বলেছিলেন, “তুমি আমাকে বুঝিয়ে দাও কীভাবে গাইতে হবে।” এটি আমার জন্য ছিল বিশাল সম্মানের।
তার সঙ্গে আমার শেষ কথা হয় তার জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানানোর সময়। তিনি মজা করে বলেছিলেন, “কিসের শুভেচ্ছা? আমি তো এখন উপরের সিঁড়ি বেয়ে উঠছি।” আমি বলেছিলাম, আমাদের এখনও তাকে দরকার।
চিরবিদায়
তিনি চলে যাওয়ায় আমি গভীরভাবে ভেঙে পড়েছি। তিনি আমাকে যে ভালোবাসা দিয়েছেন, যে সম্মান দিয়েছেন—সেগুলোই আমি আজীবন মনে রাখব। তিনি আমার জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন।
চিরশান্তিতে থাকুন, আমার প্রিয় আশা দিদি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 
























