০৮:০২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
শুধু বিজেপি-বিরোধিতা নয়, ভারতের বিরোধী জোটের ভিত্তি হতে হবে ফেডারেল গণতন্ত্র চীন এগিয়ে, ন্যাফথা সংকটে চাপে এশিয়ার পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প সুন্দরবনে কোস্টগার্ড স্টেশনে হামলা, আহত একাধিক সদস্য খুলনা সিটি মেডিকেলে ভয়াবহ আগুন, রাতভর কাজ করেছে ফায়ার সার্ভিসের ১২ ইউনিট মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পশুর হাট, ৩০ লাখ টাকার ক্ষতি গুনতে হচ্ছে ইজারাদারকে টেলর সুইফট ‘টয় স্টোরি ৫’ প্রিমিয়ারে নতুন গান গাইলেন, র্যান্ডি নিউম্যানের সঙ্গে ডুয়েট — ‘এটি একটি মাস্টারপিস’ আমির খান জুলাই ৫-এর বিয়ের কথা নিজেই নিশ্চিত করলেন: ‘মনে মনে আগেই বিয়ে করেছিলাম’ ‘রাখ’ আমাজন প্রাইমে আসছে কাল: ১৯৭৮-এর কুখ্যাত রঙা-বিল্লা হত্যাকাণ্ড নিয়ে আলী ফাজালের গ্রিপিং ক্রাইম থ্রিলার বলিউডের এ বছরের মেগাহিট ‘ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ’ এখন JioHotstar-এ, ১,৮৫২ কোটি রুপির ব্লকবাস্টার ‘হ্যায় জওয়ানি তো ইশক হোনা হ্যায়’: বরুণ ধাওয়ান-পূজা হেগড়ে-মৃণাল ঠাকুরের রোমকম ৩১ কোটি ছাড়াল

শুধু বিজেপি-বিরোধিতা নয়, ভারতের বিরোধী জোটের ভিত্তি হতে হবে ফেডারেল গণতন্ত্র

ভারতের বিরোধী রাজনীতির সামনে আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—একটি বহুদলীয় জোটকে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা যায়। ক্ষমতাসীন বিজেপির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা নিঃসন্দেহে বিরোধী দলগুলোকে একত্র করেছে। কিন্তু কেবল একটি দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া কি কোনো রাজনৈতিক জোটের স্থায়ী ভিত্তি হতে পারে? সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা বলছে, এর উত্তর নেতিবাচক।

নয়াদিল্লিতে ইন্ডিয়া জোটের সাম্প্রতিক বৈঠকে এই প্রশ্ন নতুনভাবে সামনে এসেছে। কেউ কেউ মনে করেন, সারা দেশে সাংগঠনিক উপস্থিতি থাকার কারণে কংগ্রেসই এই জোটকে একসঙ্গে ধরে রাখার প্রধান শক্তি। বাস্তবতা অবশ্য আরও জটিল। কংগ্রেস নিঃসন্দেহে জোটের সবচেয়ে বড় দল এবং তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি জোটের সংহতি কেবল কোনো একক দলের সাংগঠনিক বিস্তারের ওপর নির্ভর করে না। রাজনৈতিক ঐকমত্য, অভিন্ন লক্ষ্য এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তাই শেষ পর্যন্ত জোটের স্থায়িত্ব নির্ধারণ করে।

ইন্ডিয়া জোটের জন্ম হয়েছিল বিজেপির রাজনৈতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় জোটটি কখনও পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক কাঠামো পায়নি। কোনো আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব নির্ধারিত হয়নি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্থায়ী পদ্ধতিও গড়ে ওঠেনি। ফলে এটি মূলত একটি নির্বাচনী সমঝোতা হিসেবেই থেকে গেছে।

এই বাস্তবতা আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের দিকে নিয়ে যায়। বিরোধী দলগুলোর মধ্যে যে ঐক্য গড়ে উঠেছে, তার প্রকৃত ভিত্তি কী? অনেকাংশে বলা যায়, বিজেপির ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক প্রভাবই সেই ঐক্যের কারণ। বহু আঞ্চলিক ও জাতীয় দল মনে করে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে তাদের অস্তিত্ব এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জের মুখে। এই উদ্বেগ তাদের একত্র করেছে।

কিন্তু ভয়ের ওপর নির্মিত জোট খুব কম ক্ষেত্রেই দীর্ঘস্থায়ী হয়। কোনো রাজনৈতিক জোট যদি শুধু প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার লক্ষ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে ক্ষমতার সমীকরণ বদলালেই তার ভিত নড়বড়ে হয়ে যায়। তাই বিরোধী রাজনীতির সামনে এখন আরও বড় একটি কাজ রয়েছে—নিজেদের জন্য একটি ইতিবাচক ও নীতিনির্ভর অভিন্ন ভিত্তি তৈরি করা।

BJP v democracy': India's opposition alliance cries foul as election nears  | India | The Guardian

সেই ভিত্তি হতে পারে ভারতের ফেডারেল কাঠামো এবং সাংবিধানিক গণতন্ত্র রক্ষার অঙ্গীকার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কেন্দ্রের হাতে ক্ষমতার ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রীকরণ নিয়ে বহু রাজ্য উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অর্থনৈতিক বণ্টন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, ভাষানীতি কিংবা রাজ্যের সাংবিধানিক ক্ষমতা—বিভিন্ন প্রশ্নে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক বেড়েছে। ফলে ফেডারেলিজমের প্রশ্ন এখন কেবল সাংবিধানিক তত্ত্বের বিষয় নয়; এটি রাজনৈতিক বাস্তবতার কেন্দ্রে এসে দাঁড়িয়েছে।

ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় দেশে আঞ্চলিক দলগুলোর উত্থান কোনো দুর্ঘটনা নয়। ভাষা, সংস্কৃতি, আঞ্চলিক পরিচয় এবং স্থানীয় স্বার্থের প্রতিনিধিত্বের মধ্য দিয়েই তারা নিজেদের রাজনৈতিক বৈধতা অর্জন করেছে। তাই একটি জাতীয় বিরোধী জোট যদি এই বাস্তবতাকে যথাযথ গুরুত্ব না দেয়, তাহলে তার ভেতরে অবিশ্বাস তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

কংগ্রেসের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। দলটি সংবিধান, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিলেও, অনেক সময় রাজ্যের অধিকারের প্রশ্নে তার অবস্থান যথেষ্ট স্পষ্ট নয় বলে আঞ্চলিক দলগুলোর অভিযোগ রয়েছে। এই দ্বিধা দূর না হলে কংগ্রেসকে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নয়, বরং বিজেপির আরেকটি সংস্করণ হিসেবে দেখার ঝুঁকি থেকে যায়।

আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিরোধী জোটের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজেদের অভিন্ন দর্শন নির্ধারণ করা। বিজেপি-বিরোধিতা সেই দর্শনের একটি অংশ হতে পারে, কিন্তু সেটিই পুরো দর্শন নয়। প্রকৃত সংহতি আসবে তখনই, যখন জাতীয় ও আঞ্চলিক দলগুলো একসঙ্গে স্বীকার করবে যে ভারতের গণতন্ত্রের শক্তি তার বৈচিত্র্যে, আর সেই বৈচিত্র্যের সাংবিধানিক রূপ হলো ফেডারেল ব্যবস্থা।

অতএব, ইন্ডিয়া জোটের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে শুধু নির্বাচনী কৌশলের ওপর নয়, বরং তারা কতটা আন্তরিকভাবে ফেডারেল গণতন্ত্র, রাজ্যের অধিকার এবং সাংবিধানিক ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নকে নিজেদের রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দিতে পারে তার ওপর। যদি সেই আদর্শিক ভিত্তি তৈরি হয়, তাহলে জোট কেবল একটি নির্বাচনী সমীকরণ হয়ে থাকবে না; বরং ভারতের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক প্রকল্পে পরিণত হতে পারবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

শুধু বিজেপি-বিরোধিতা নয়, ভারতের বিরোধী জোটের ভিত্তি হতে হবে ফেডারেল গণতন্ত্র

শুধু বিজেপি-বিরোধিতা নয়, ভারতের বিরোধী জোটের ভিত্তি হতে হবে ফেডারেল গণতন্ত্র

০৮:০০:২৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬

ভারতের বিরোধী রাজনীতির সামনে আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—একটি বহুদলীয় জোটকে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা যায়। ক্ষমতাসীন বিজেপির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা নিঃসন্দেহে বিরোধী দলগুলোকে একত্র করেছে। কিন্তু কেবল একটি দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া কি কোনো রাজনৈতিক জোটের স্থায়ী ভিত্তি হতে পারে? সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা বলছে, এর উত্তর নেতিবাচক।

নয়াদিল্লিতে ইন্ডিয়া জোটের সাম্প্রতিক বৈঠকে এই প্রশ্ন নতুনভাবে সামনে এসেছে। কেউ কেউ মনে করেন, সারা দেশে সাংগঠনিক উপস্থিতি থাকার কারণে কংগ্রেসই এই জোটকে একসঙ্গে ধরে রাখার প্রধান শক্তি। বাস্তবতা অবশ্য আরও জটিল। কংগ্রেস নিঃসন্দেহে জোটের সবচেয়ে বড় দল এবং তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি জোটের সংহতি কেবল কোনো একক দলের সাংগঠনিক বিস্তারের ওপর নির্ভর করে না। রাজনৈতিক ঐকমত্য, অভিন্ন লক্ষ্য এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তাই শেষ পর্যন্ত জোটের স্থায়িত্ব নির্ধারণ করে।

ইন্ডিয়া জোটের জন্ম হয়েছিল বিজেপির রাজনৈতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় জোটটি কখনও পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক কাঠামো পায়নি। কোনো আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব নির্ধারিত হয়নি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্থায়ী পদ্ধতিও গড়ে ওঠেনি। ফলে এটি মূলত একটি নির্বাচনী সমঝোতা হিসেবেই থেকে গেছে।

এই বাস্তবতা আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের দিকে নিয়ে যায়। বিরোধী দলগুলোর মধ্যে যে ঐক্য গড়ে উঠেছে, তার প্রকৃত ভিত্তি কী? অনেকাংশে বলা যায়, বিজেপির ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক প্রভাবই সেই ঐক্যের কারণ। বহু আঞ্চলিক ও জাতীয় দল মনে করে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে তাদের অস্তিত্ব এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জের মুখে। এই উদ্বেগ তাদের একত্র করেছে।

কিন্তু ভয়ের ওপর নির্মিত জোট খুব কম ক্ষেত্রেই দীর্ঘস্থায়ী হয়। কোনো রাজনৈতিক জোট যদি শুধু প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার লক্ষ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে ক্ষমতার সমীকরণ বদলালেই তার ভিত নড়বড়ে হয়ে যায়। তাই বিরোধী রাজনীতির সামনে এখন আরও বড় একটি কাজ রয়েছে—নিজেদের জন্য একটি ইতিবাচক ও নীতিনির্ভর অভিন্ন ভিত্তি তৈরি করা।

BJP v democracy': India's opposition alliance cries foul as election nears  | India | The Guardian

সেই ভিত্তি হতে পারে ভারতের ফেডারেল কাঠামো এবং সাংবিধানিক গণতন্ত্র রক্ষার অঙ্গীকার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কেন্দ্রের হাতে ক্ষমতার ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রীকরণ নিয়ে বহু রাজ্য উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অর্থনৈতিক বণ্টন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, ভাষানীতি কিংবা রাজ্যের সাংবিধানিক ক্ষমতা—বিভিন্ন প্রশ্নে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক বেড়েছে। ফলে ফেডারেলিজমের প্রশ্ন এখন কেবল সাংবিধানিক তত্ত্বের বিষয় নয়; এটি রাজনৈতিক বাস্তবতার কেন্দ্রে এসে দাঁড়িয়েছে।

ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় দেশে আঞ্চলিক দলগুলোর উত্থান কোনো দুর্ঘটনা নয়। ভাষা, সংস্কৃতি, আঞ্চলিক পরিচয় এবং স্থানীয় স্বার্থের প্রতিনিধিত্বের মধ্য দিয়েই তারা নিজেদের রাজনৈতিক বৈধতা অর্জন করেছে। তাই একটি জাতীয় বিরোধী জোট যদি এই বাস্তবতাকে যথাযথ গুরুত্ব না দেয়, তাহলে তার ভেতরে অবিশ্বাস তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

কংগ্রেসের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। দলটি সংবিধান, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিলেও, অনেক সময় রাজ্যের অধিকারের প্রশ্নে তার অবস্থান যথেষ্ট স্পষ্ট নয় বলে আঞ্চলিক দলগুলোর অভিযোগ রয়েছে। এই দ্বিধা দূর না হলে কংগ্রেসকে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নয়, বরং বিজেপির আরেকটি সংস্করণ হিসেবে দেখার ঝুঁকি থেকে যায়।

আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিরোধী জোটের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজেদের অভিন্ন দর্শন নির্ধারণ করা। বিজেপি-বিরোধিতা সেই দর্শনের একটি অংশ হতে পারে, কিন্তু সেটিই পুরো দর্শন নয়। প্রকৃত সংহতি আসবে তখনই, যখন জাতীয় ও আঞ্চলিক দলগুলো একসঙ্গে স্বীকার করবে যে ভারতের গণতন্ত্রের শক্তি তার বৈচিত্র্যে, আর সেই বৈচিত্র্যের সাংবিধানিক রূপ হলো ফেডারেল ব্যবস্থা।

অতএব, ইন্ডিয়া জোটের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে শুধু নির্বাচনী কৌশলের ওপর নয়, বরং তারা কতটা আন্তরিকভাবে ফেডারেল গণতন্ত্র, রাজ্যের অধিকার এবং সাংবিধানিক ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নকে নিজেদের রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দিতে পারে তার ওপর। যদি সেই আদর্শিক ভিত্তি তৈরি হয়, তাহলে জোট কেবল একটি নির্বাচনী সমীকরণ হয়ে থাকবে না; বরং ভারতের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক প্রকল্পে পরিণত হতে পারবে।