বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা এখনও অনেকাংশে অর্থের পরিমাণকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। কত ঋণ দেওয়া হবে, কত তহবিল জোগাড় করা যাবে বা কোন দেশ কত ডলার পাবে—এসব প্রশ্নই সাধারণত আলোচনার কেন্দ্রে থাকে। কিন্তু বাস্তবতা দ্রুত বদলাচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যম আয়ের দেশগুলোর অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে যে উন্নয়নের প্রধান বাধা এখন আর কেবল অর্থের অভাব নয়; বরং জটিল প্রকল্প পরিকল্পনা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং নীতি বাস্তবায়নের মতো বিষয়গুলোই ক্রমশ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতা বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একসময় যেসব প্রতিষ্ঠান উন্নয়নশীল দেশগুলোকে মূলধন সরবরাহের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, আজ তাদের সামনে প্রশ্ন হলো—যখন অনেক দেশ নিজস্ব বাজার থেকেই অর্থ সংগ্রহ করতে সক্ষম, তখন তাদের ভূমিকা কী হবে?
ভারতের অভিজ্ঞতা এই প্রশ্নের একটি তাৎপর্যপূর্ণ উত্তর দেয়। গত কয়েক দশকে দেশটির আর্থিক বাজার এতটাই বিস্তৃত ও গভীর হয়েছে যে সরকারি ব্যয়ের ঘাটতি পূরণে বিদেশি অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে। একসময় যে ঘাটতির উল্লেখযোগ্য অংশ বাইরের অর্থে পূরণ হতো, এখন তার বড় অংশই অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আসে। ফলে বহুপাক্ষিক ঋণের আর্থিক গুরুত্ব আগের তুলনায় অনেক কম।
এটি শুধু ভারতের গল্প নয়। বহু মধ্যম আয়ের দেশ একই পথ অনুসরণ করছে। তাদের নিজস্ব ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বন্ড বাজার এবং আর্থিক অবকাঠামো শক্তিশালী হয়েছে। একই সময়ে বৈশ্বিক সুদের হার বৃদ্ধি এবং স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে বৈদেশিক ঋণের খরচও বেড়েছে। ফলে বহুপাক্ষিক ঋণ আর আগের মতো আকর্ষণীয় নয়।
এই প্রেক্ষাপটে উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর প্রকৃত শক্তি কোথায়? উত্তরটি অর্থ নয়, জ্ঞান।
:max_bytes(150000):strip_icc()/GettyImages-21581859271-83f8fb3192e447bc952500d9a58c5145.jpg)
উন্নয়নের নতুন চাহিদা
একটি দেশের উন্নয়ন অগ্রসর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার অগ্রাধিকারও বদলে যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা মৌলিক সেবায় বিনিয়োগই প্রধান লক্ষ্য থাকে। কিন্তু অর্থনীতি বড় হলে অবকাঠামো, নগরায়ন, শিল্পায়ন, পরিবহন ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিনির্ভর খাতগুলো বেশি গুরুত্ব পায়।
এসব ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রধান বাধা প্রায়ই অর্থ নয়। বরং সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তিগত নকশা, সমন্বিত ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি চিন্তাভাবনার অভাব বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
ধরা যাক একটি নগর পরিবহন প্রকল্প। একটি শহরে মেট্রোরেল নির্মাণের জন্য অর্থ জোগাড় করা হয়তো সম্ভব। কিন্তু কীভাবে সেই মেট্রোকে বাস, উপশহরীয় রেল, পথচারী অবকাঠামো এবং নগর পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় করা হবে, সেটিই আসল প্রশ্ন। একটি সফল প্রকল্প কেবল একটি রেললাইন নির্মাণ করে না; এটি পুরো শহরের উন্নয়ন ভাবনাকে নতুনভাবে সাজায়।
এই ধরনের ক্ষেত্রে উন্নয়ন ব্যাংকের সবচেয়ে মূল্যবান অবদান হতে পারে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, নীতি-জ্ঞান এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা। অর্থায়ন তখন কেবল একটি বাহন; প্রকৃত সম্পদ হয়ে ওঠে জ্ঞানের স্থানান্তর।
ঋণের সঙ্গে অতিরিক্ত মূল্য
অনেক সরকার এখন উন্নয়ন অর্থায়নের ক্ষেত্রে এমন একটি ধারণার প্রতি আগ্রহী, যেখানে ঋণের পাশাপাশি অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়া যায়। অর্থাৎ একটি ডলার ঋণ কেবল একটি ডলার অর্থের সমান হবে না; এর সঙ্গে যুক্ত থাকবে প্রযুক্তি, দক্ষতা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক সেরা অনুশীলনের অভিজ্ঞতা।
এই চিন্তাধারা উন্নয়ন অর্থায়নকে নতুন মাত্রা দেয়। কারণ উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নির্ভর করে শুধু অর্থ ব্যয়ের ওপর নয়, সেই অর্থ কত দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপরও।
একই সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো বহুপাক্ষিক অর্থায়ন যেন দেশীয় সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগকে প্রতিস্থাপন না করে, বরং উৎসাহিত করে। অর্থাৎ উন্নয়ন ব্যাংকের কাজ হবে নতুন বিনিয়োগের পথ খুলে দেওয়া এবং ঝুঁকি কমিয়ে বেসরকারি মূলধনকে আকৃষ্ট করা।
প্রতিযোগিতার নতুন বাস্তবতা
আজকের মধ্যম আয়ের দেশগুলোর সামনে অর্থায়নের উৎস অনেক বেশি। তারা বহুপাক্ষিক ব্যাংকের পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক ঋণদাতা, আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার এবং নিজস্ব আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে।
এই প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর পক্ষে শুধু কম সুদে ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে নিজেদের প্রাসঙ্গিক রাখা কঠিন। তাদের আলাদা পরিচয় গড়ে উঠতে হবে জ্ঞানভিত্তিক অংশীদার হিসেবে।
তাদের বিশেষ শক্তি হলো বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা একত্র করা, জটিল প্রকল্পের কাঠামো তৈরি করা এবং এমন বিনিয়োগ মডেল গড়ে তোলা যা বেসরকারি খাতকে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করে। উন্নয়নের ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই নির্ভর করবে এই সক্ষমতার ওপর।
প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের প্রয়োজন
তবে এই রূপান্তর সহজ নয়। বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ কাঠামো এখনও অনেকাংশে ঋণ বিতরণের ওপর নির্ভরশীল। তাদের সাফল্য প্রায়ই মাপা হয় কত অর্থ বিতরণ করা হয়েছে তার ভিত্তিতে।
কিন্তু জ্ঞান স্থানান্তর, সক্ষমতা বৃদ্ধি বা নীতি সংস্কারের প্রভাব পরিমাপ করা অনেক কঠিন। এসব ক্ষেত্রে ফলাফল দীর্ঘমেয়াদে দেখা যায় এবং সেগুলোকে কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের অবদানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করাও সহজ নয়।
তবু ভবিষ্যতের উন্নয়ন অর্থায়নকে কার্যকর করতে হলে এই মানসিকতা বদলাতে হবে। ঋণের পরিমাণ নয়, উন্নয়নের গুণগত প্রভাবকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। যে প্রতিষ্ঠান অর্থের পাশাপাশি জ্ঞান, সক্ষমতা এবং উদ্ভাবনী সমাধান দিতে পারবে, আগামী দশকগুলোতে উন্নয়নের নেতৃত্ব তার হাতেই থাকবে।
* তানু এম. গোয়েল ভারতীয় আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক গবেষণা পরিষদের জ্যেষ্ঠ ফেলো। শেখর আয়ার প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।
তানু এম. গোয়েল ও শেখর আয়ার 


















