ইরান যুদ্ধের প্রভাবে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর এশিয়ার বহু দেশের পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। তবে এই সংকটের মধ্যেও তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে চীন। বৈচিত্র্যময় জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা এবং বিকল্প কাঁচামাল ব্যবহারের সক্ষমতার কারণে দেশটি সংকটের প্রভাব অনেকটাই সামলে নিতে পেরেছে।
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুটগুলোর একটি হরমুজ প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। এর মধ্যে ৮০ শতাংশেরও বেশি তেল এশিয়ার বাজারের উদ্দেশ্যে যেত। ফলে প্রণালিটি কার্যত অচল হয়ে পড়ার পর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এশিয়ার শিল্পখাত।
ন্যাফথা নির্ভর শিল্পে চাপ
জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো রাসায়নিক, প্লাস্টিক ও কালি উৎপাদনের জন্য ব্যাপকভাবে আমদানিকৃত ন্যাফথার ওপর নির্ভরশীল। ন্যাফথা মূলত অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের মাধ্যমে উৎপাদিত হয়।
সরবরাহ সংকটের কারণে জাপানে ন্যাফথা-নির্ভর ইথিলিন কারখানাগুলোর উৎপাদন কমানো হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের কিছু কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধও হয়ে গেছে। এসব দেশ এখন মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে থেকে ন্যাফথা সংগ্রহের চেষ্টা করছে, যাতে সরবরাহ শৃঙ্খল সচল রাখা যায়।
কেন সুবিধাজনক অবস্থানে চীন
বিশ্বের বৃহত্তম রাসায়নিক উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে চীন এই সংকটে তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির অপরিশোধিত তেলের উৎস শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নয়; রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকেও তারা জ্বালানি সংগ্রহ করে।
এছাড়া চীনের রাসায়নিক শিল্প কেবল ন্যাফথার ওপর নির্ভরশীল নয়। প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে উৎপাদিত ইথেন এবং কয়লাভিত্তিক কাঁচামালও তারা ব্যবহার করে থাকে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ন্যাফথা সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হলেও উৎপাদন অব্যাহত রাখার সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
বাজারে বাড়ছে চীনের প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে থেকে সংগ্রহ করা ন্যাফথার দাম সংঘাতের শুরুর দিকে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল। যদিও পরে কিছুটা কমেছে, তবুও তা এখনো সংঘাত-পূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি।
এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে আগে থেকেই মূল্য প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা চীনা রাসায়নিক পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে আরও শক্তিশালী অবস্থান নিতে পারে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এতে জাপানসহ এশিয়ার অন্যান্য দেশের পেট্রোকেমিক্যাল খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও দুর্বল হবে।
পুনর্গঠন ও একীভূতকরণের পথে শিল্পখাত
চীনের সস্তা রাসায়নিক পণ্যের চাপে এশিয়ার পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প বহুদিন ধরেই লাভজনকতা সংকটে ভুগছিল। বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকট সেই চাপকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়া সরকার ইথিলিন কারখানাগুলোর একীভূতকরণে উদ্যোগ নিয়েছে। থাইল্যান্ডেও রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি কোম্পানি এবং শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠীগুলো মৌলিক রাসায়নিক ও সাধারণ মানের প্লাস্টিক ব্যবসা একীভূত করার সম্ভাবনা যাচাই করছে।
শিল্প নেতাদের মতে, খাতটি ইতোমধ্যেই উৎপাদন সক্ষমতা কমানো, কারখানার ব্যবহার বাড়ানো এবং উচ্চমূল্যের বিশেষায়িত পণ্যের দিকে ঝুঁকছিল। বর্তমান সংকট সেই পরিবর্তনের গতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
আঞ্চলিক সহযোগিতার আহ্বান
ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা এবং জলবায়ু-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জের মধ্যে শিল্প নেতারা আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর জোর দিচ্ছেন। জাপান এশীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পদ ও কাঁচামাল সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করার লক্ষ্যে নতুন উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয়, ঝুঁকি ভাগাভাগি এবং বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
#চীন #পেট্রোকেমিক্যাল #ন্যাফথা #ইরানযুদ্ধ #হরমুজপ্রণালি #এশিয়াঅর্থনীতি #রাসায়নিকশিল্প #জাপান #দক্ষিণকোরিয়া #বৈশ্বিকবাজার
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















