০৮:০৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ০১ অগাস্ট ২০২৬
মৃত্যুর দিকে ছুটে চলা জীবনে থামার সময় কি এখনও আসেনি? প্যাক্স সিলিকা: কর্মসংস্থান নাকি নতুন নির্ভরতা? ফিলিপাইনের সামনে সুযোগের পাশাপাশি বড় ঝুঁকির সতর্কবার্তা যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সার্জিও গরের ঢাকা সফর শেষ, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক আরও জোরদারের অঙ্গীকার সঙ্গীতের গণ্ডি ভেঙে নিজেদের পথ: স্বাধীন ব্যান্ড দ্য অ্যারিস্টোক্র্যাটসের সাফল্যের গল্প যুদ্ধের পরিসংখ্যানের আড়ালে যে মানুষগুলো থাকে ইংল্যান্ডের ৬০ বছরের বিশ্বকাপ আক্ষেপ: ৪৫৪ অভিষেক, ১৫ কোচ, তবু অধরাই শিরোপা ব্রড পিকে তুষারধস: নিখোঁজ ৭ আরোহীর সন্ধানে আবারও উদ্ধার অভিযান, তিনজনের মরদেহ উদ্ধার আলজেরিয়া থেকে দেশে ফিরলেন ৪ বাংলাদেশি, অবৈধ অবস্থানের অভিযোগে আটক ছিলেন ভাঁজযোগ্য ফোনের লড়াইয়ে স্যামসাং এগিয়ে, কিন্তু শেষ জয় নির্ভর করবে ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতার গল্পে চ্যাটজিপিটিকে শুধু প্রশ্ন নয়, বলুন ‘আমাকে মুগ্ধ করো’—ওপেনএআই কর্মকর্তার ভিন্নধর্মী পরামর্শ

ভাঁজযোগ্য ফোনের লড়াইয়ে স্যামসাং এগিয়ে, কিন্তু শেষ জয় নির্ভর করবে ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতার গল্পে

স্যামসাং আবারও দেখিয়ে দিল, ভাঁজযোগ্য স্মার্টফোন আর পরীক্ষামূলক প্রযুক্তি নয়; এটি এখন পরিণত একটি পণ্যের শ্রেণি। নতুন গ্যালাক্সি জেড ফোল্ড৮ আল্ট্রা, ফোল্ড৮ এবং ফ্লিপ৮ উন্মোচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি শুধু নতুন হার্ডওয়্যার বাজারে আনেনি, বরং একটি বড় কৌশলগত বার্তাও দিয়েছে—ভবিষ্যতের মোবাইল অভিজ্ঞতার কেন্দ্রবিন্দু হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং পরস্পর সংযুক্ত ডিভাইসের একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম।

তবে প্রযুক্তি শিল্পে নেতৃত্ব ধরে রাখা কখনোই কেবল উন্নত যন্ত্র তৈরির বিষয় নয়। বাজারে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পর সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো মানুষকে বোঝানো যে নতুন প্রযুক্তি তাদের দৈনন্দিন জীবনকে সত্যিই বদলে দিতে পারে। আর সেখানেই এখন স্যামসাংয়ের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

প্রায় আট বছরের ধারাবাহিক উন্নয়নের পর স্যামসাংয়ের ভাঁজযোগ্য ফোনগুলো আগের তুলনায় পাতলা, হালকা, টেকসই এবং আরও পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে কোম্পানি এখন আর এক ধরনের ব্যবহারকারীর জন্য একটি মাত্র ডিভাইস তৈরি করছে না। যারা সর্বোচ্চ উৎপাদনশীলতা চান, যারা ভারসাম্যপূর্ণ অভিজ্ঞতা চান এবং যারা বহনযোগ্যতা ও নকশাকে অগ্রাধিকার দেন—তাদের জন্য আলাদা আলাদা পণ্য সাজানো হয়েছে। এই বৈচিত্র্য শুধু বিপণনের কৌশল নয়; এটি স্বীকার করে যে আধুনিক স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের চাহিদা আর একরকম নয়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই নতুন প্রতিযোগিতার কেন্দ্র

একই সময়ে স্যামসাংয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কোম্পানিটি এখন স্মার্টফোনকে আর একক ডিভাইস হিসেবে দেখছে না। ফোন, ঘড়ি এবং ভবিষ্যতের স্মার্ট চশমাকে একটি অভিন্ন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করার পরিকল্পনা তাদের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে।

কোয়ালকমের সঙ্গে স্যামসাংয়ের অংশীদারত্বও তাই শুধু প্রসেসর সরবরাহকারী ও স্মার্টফোন নির্মাতার প্রচলিত সম্পর্কের মধ্যে আটকে নেই। স্ন্যাপড্রাগন প্ল্যাটফর্মকে কেন্দ্র করে স্মার্টফোন, স্মার্টওয়াচ এবং ভবিষ্যতের এক্সআর ডিভাইসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অভিজ্ঞতা বিস্তারের চেষ্টা চলছে।

এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রযুক্তি শিল্পের একটি বড় পরিবর্তনের প্রতিফলন। এখন প্রসেসরের গতি বা গ্রাফিকস সক্ষমতাই একমাত্র মাপকাঠি নয়। একটি ডিভাইস ব্যবহারকারীকে কতটা প্রাসঙ্গিক, ব্যক্তিগত এবং ধারাবাহিক সহায়তা দিতে পারে, সেটিও প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হয়ে উঠছে।

প্রিমিয়াম দাম মানেই প্রিমিয়াম প্রত্যাশা

কিন্তু এখানেই প্রশ্নও তৈরি হয়। স্যামসাং তার পণ্যের মধ্যে যে পার্থক্য তৈরি করেছে, বিশেষ করে ফোল্ড৮ এবং ফোল্ড৮ আল্ট্রার ক্যামেরা সক্ষমতার ক্ষেত্রে, সেটি কি সত্যিই যৌক্তিক?

গ্যালাক্সি জেড ফোল্ড৮-এর প্রারম্ভিক মূল্য ১ হাজার ৮৯৯ ডলার। এমন মূল্যের একটি ফোন কিনতে আগ্রহী ব্যবহারকারীরা সাধারণত মৌলিক কোনো সুবিধায় আপস করতে চাইবেন না। অথচ স্যামসাং তার সবচেয়ে উন্নত ক্যামেরা ব্যবস্থা আরও ব্যয়বহুল ফোল্ড৮ আল্ট্রার জন্য সংরক্ষিত রেখেছে।

বিশেষ করে স্মার্টফোনের বাজারে ক্যামেরা এখন বিলাসিতা নয়, বরং ক্রয় সিদ্ধান্তের অন্যতম প্রধান কারণ। একজন ক্রেতা যখন প্রায় দুই হাজার ডলার ব্যয় করছেন, তখন তিনি স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা করবেন যে ডিভাইসটির ক্যামেরাও কোম্পানির সেরা প্রযুক্তির প্রতিনিধিত্ব করবে।

ফলে ফোল্ড৮ ও ফোল্ড৮ আল্ট্রার মধ্যে পার্থক্য তৈরি করতে গিয়ে স্যামসাং এমন একটি সীমারেখা টেনে ফেলেছে কি না, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ফোল্ড৮-এর মূল্যকে ক্রেতার চোখে দুর্বল করে দিতে পারে—সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

Samsung unveils first multi-folding phone as competition set to heat up |  Bonikbarta

অ্যাপলের প্রবেশ বদলে দিতে পারে বাজারের হিসাব

এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য আরও বড় হয়ে উঠছে সম্ভাব্য নতুন প্রতিযোগিতার কারণে। অ্যাপল যদি প্রত্যাশা অনুযায়ী নিজেদের প্রথম ভাঁজযোগ্য আইফোন বাজারে আনে, তাহলে তাদের পণ্যের অবস্থান নির্ধারণ পুরো বাজারের প্রত্যাশাই দ্রুত বদলে দিতে পারে।

বিশেষ করে অ্যাপল যদি ভাঁজযোগ্য ফোনে ক্যামেরাসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রিমিয়াম বৈশিষ্ট্যগুলোতে কম আপসের পথ বেছে নেয়, তাহলে স্যামসাংয়ের বর্তমান বিভাজন কৌশল নতুন চাপের মুখে পড়তে পারে।

প্রযুক্তি ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, একটি নতুন ধারণা প্রথম বাজারে আনা আর সেটিকে গণমানুষের কাছে অপরিহার্য করে তোলা এক বিষয় নয়। নতুন প্রযুক্তিকে ব্যবহারকারীর দৈনন্দিন অভ্যাসের সঙ্গে যুক্ত করতে পারা শেষ পর্যন্ত বাজারের গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।

হার্ডওয়্যারের লড়াইয়ের পর গল্পের লড়াই

স্যামসাংয়ের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত এখানেই।

ভাঁজযোগ্য ফোনে মাল্টিটাস্কিং করা যায়, বড় পর্দায় ভিডিও দেখা যায়, গেম খেলা সুবিধাজনক, একই সঙ্গে একাধিক অ্যাপ চালানো যায় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর বিভিন্ন কাজও সহজ করা সম্ভব। এসব সুবিধা বাস্তব এবং গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু একজন সাধারণ স্মার্টফোন ব্যবহারকারী কেন তার পরিচিত ফোন ছেড়ে অনেক বেশি দাম দিয়ে একটি ভাঁজযোগ্য ডিভাইস কিনবেন?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু ফিচারের তালিকা দিয়ে দেওয়া কঠিন।

অ্যাপলের দীর্ঘদিনের একটি শক্তি হলো প্রযুক্তিকে প্রকৌশলগত সাফল্যের গল্প হিসেবে উপস্থাপন না করে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের পরিবর্তনের গল্প হিসেবে তুলে ধরা। অ্যাপল যদি ভাঁজযোগ্য ফোন নিয়ে বাজারে আসে, তাহলে তারা সম্ভবত প্রযুক্তিটি কী করতে পারে—তার পাশাপাশি মানুষ কেন সেটি চাইবে, সেই ব্যাখ্যাকে সামনে নিয়ে আসবে।

স্যামসাং প্রকৌশলের ক্ষেত্রে অনেকটাই এগিয়ে গেছে। এখন তাদের প্রতিযোগিতা হবে ব্যবহারকারীর কাছে সেই প্রকৌশলের প্রয়োজনীয়তা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে।

স্মার্টওয়াচেও বদলে যাচ্ছে লক্ষ্য

ভাঁজযোগ্য স্মার্টফোন নতুন পণ্য ঘোষণার কেন্দ্রে থাকলেও স্যামসাংয়ের স্মার্টওয়াচ কৌশলের পরিবর্তনও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

গ্যালাক্সি ওয়াচ আল্ট্রা২ এবং গ্যালাক্সি ওয়াচ৯ দেখাচ্ছে যে স্মার্টওয়াচকে কোম্পানিটি আর শুধু ব্যায়াম কিংবা দৈনিক শারীরিক কার্যক্রম পরিমাপের যন্ত্র হিসেবে দেখছে না। স্বাস্থ্য সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সেই তথ্য বিশ্লেষণ, প্রবণতা শনাক্ত এবং ব্যবহারকারীর জন্য প্রাসঙ্গিক পরামর্শ তৈরির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে প্রযুক্তিটি।

এই পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি মূল্য হয়তো কোনো একটি হার্ডওয়্যার বৈশিষ্ট্যের চেয়েও বেশি।

কারণ স্মার্ট ডিভাইস যদি শুধু বলে দেয় আজ একজন মানুষ কত কদম হাঁটলেন, সেটি এক ধরনের সেবা। কিন্তু সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে যদি তার অভ্যাস সম্পর্কে অর্থবহ ধারণা দিতে পারে এবং স্বাস্থ্যকর পরিবর্তনের পথ দেখাতে পারে, তাহলে ডিভাইসটির ভূমিকা সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে যায়।

Samsung Galaxy Z Fold 8 vs. Z Fold 8 Ultra: The Big Differences After  Trying Out Both Foldable Phones - CNET

শেষ পর্যন্ত লড়াই মূল্য প্রমাণের

সব মিলিয়ে স্যামসাংয়ের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে ভাঁজযোগ্য স্মার্টফোন প্রযুক্তি এখন পরিণত একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফোনগুলো আরও ব্যবহারযোগ্য হয়েছে, পণ্যের পরিসর বিস্তৃত হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে পুরো ইকোসিস্টেমের কেন্দ্রে নিয়ে আসা হচ্ছে এবং স্মার্টওয়াচ থেকে ভবিষ্যতের স্মার্ট চশমা পর্যন্ত একই প্রযুক্তিগত দর্শনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

কিন্তু প্রযুক্তি পরিণত হওয়া আর বাজার পরিণত হওয়া একই বিষয় নয়।

এখন সবচেয়ে বড় বাধা সম্ভবত আর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নয়। প্রশ্ন হলো, ব্যবহারকারীরা এই অতিরিক্ত সক্ষমতার জন্য অতিরিক্ত মূল্য দিতে প্রস্তুত কি না।

ভাঁজযোগ্য ফোনের ভবিষ্যৎ তাই শুধু আরও পাতলা ডিভাইস, শক্তিশালী প্রসেসর, উন্নত হিঞ্জ কিংবা উজ্জ্বল ডিসপ্লের ওপর নির্ভর করবে না। নির্ভর করবে প্রযুক্তিটি মানুষের জীবনে এমন কী মূল্য যোগ করছে, যা প্রচলিত স্মার্টফোন দিতে পারছে না।

স্যামসাং প্রযুক্তিগত ভিত্তি অনেকটাই তৈরি করে ফেলেছে। এখন তাদের সবচেয়ে বড় কাজ হলো সেই প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা প্রতিষ্ঠা করা।

আর অ্যাপল যদি সত্যিই এই বাজারে প্রবেশ করে, তাহলে ভাঁজযোগ্য স্মার্টফোনের পরবর্তী যুদ্ধটি সম্ভবত কে প্রথম প্রযুক্তি তৈরি করেছে তা নিয়ে হবে না; বরং কে সবচেয়ে সফলভাবে মানুষকে বোঝাতে পারে যে এই প্রযুক্তি কেন তাদের জীবনের অংশ হওয়া উচিত—সেটিই হয়ে উঠবে আসল প্রতিযোগিতা।

জনপ্রিয় সংবাদ

মৃত্যুর দিকে ছুটে চলা জীবনে থামার সময় কি এখনও আসেনি?

ভাঁজযোগ্য ফোনের লড়াইয়ে স্যামসাং এগিয়ে, কিন্তু শেষ জয় নির্ভর করবে ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতার গল্পে

০৬:২১:৪০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১ অগাস্ট ২০২৬

স্যামসাং আবারও দেখিয়ে দিল, ভাঁজযোগ্য স্মার্টফোন আর পরীক্ষামূলক প্রযুক্তি নয়; এটি এখন পরিণত একটি পণ্যের শ্রেণি। নতুন গ্যালাক্সি জেড ফোল্ড৮ আল্ট্রা, ফোল্ড৮ এবং ফ্লিপ৮ উন্মোচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি শুধু নতুন হার্ডওয়্যার বাজারে আনেনি, বরং একটি বড় কৌশলগত বার্তাও দিয়েছে—ভবিষ্যতের মোবাইল অভিজ্ঞতার কেন্দ্রবিন্দু হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং পরস্পর সংযুক্ত ডিভাইসের একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম।

তবে প্রযুক্তি শিল্পে নেতৃত্ব ধরে রাখা কখনোই কেবল উন্নত যন্ত্র তৈরির বিষয় নয়। বাজারে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পর সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো মানুষকে বোঝানো যে নতুন প্রযুক্তি তাদের দৈনন্দিন জীবনকে সত্যিই বদলে দিতে পারে। আর সেখানেই এখন স্যামসাংয়ের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

প্রায় আট বছরের ধারাবাহিক উন্নয়নের পর স্যামসাংয়ের ভাঁজযোগ্য ফোনগুলো আগের তুলনায় পাতলা, হালকা, টেকসই এবং আরও পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে কোম্পানি এখন আর এক ধরনের ব্যবহারকারীর জন্য একটি মাত্র ডিভাইস তৈরি করছে না। যারা সর্বোচ্চ উৎপাদনশীলতা চান, যারা ভারসাম্যপূর্ণ অভিজ্ঞতা চান এবং যারা বহনযোগ্যতা ও নকশাকে অগ্রাধিকার দেন—তাদের জন্য আলাদা আলাদা পণ্য সাজানো হয়েছে। এই বৈচিত্র্য শুধু বিপণনের কৌশল নয়; এটি স্বীকার করে যে আধুনিক স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের চাহিদা আর একরকম নয়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই নতুন প্রতিযোগিতার কেন্দ্র

একই সময়ে স্যামসাংয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কোম্পানিটি এখন স্মার্টফোনকে আর একক ডিভাইস হিসেবে দেখছে না। ফোন, ঘড়ি এবং ভবিষ্যতের স্মার্ট চশমাকে একটি অভিন্ন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করার পরিকল্পনা তাদের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে।

কোয়ালকমের সঙ্গে স্যামসাংয়ের অংশীদারত্বও তাই শুধু প্রসেসর সরবরাহকারী ও স্মার্টফোন নির্মাতার প্রচলিত সম্পর্কের মধ্যে আটকে নেই। স্ন্যাপড্রাগন প্ল্যাটফর্মকে কেন্দ্র করে স্মার্টফোন, স্মার্টওয়াচ এবং ভবিষ্যতের এক্সআর ডিভাইসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অভিজ্ঞতা বিস্তারের চেষ্টা চলছে।

এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রযুক্তি শিল্পের একটি বড় পরিবর্তনের প্রতিফলন। এখন প্রসেসরের গতি বা গ্রাফিকস সক্ষমতাই একমাত্র মাপকাঠি নয়। একটি ডিভাইস ব্যবহারকারীকে কতটা প্রাসঙ্গিক, ব্যক্তিগত এবং ধারাবাহিক সহায়তা দিতে পারে, সেটিও প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হয়ে উঠছে।

প্রিমিয়াম দাম মানেই প্রিমিয়াম প্রত্যাশা

কিন্তু এখানেই প্রশ্নও তৈরি হয়। স্যামসাং তার পণ্যের মধ্যে যে পার্থক্য তৈরি করেছে, বিশেষ করে ফোল্ড৮ এবং ফোল্ড৮ আল্ট্রার ক্যামেরা সক্ষমতার ক্ষেত্রে, সেটি কি সত্যিই যৌক্তিক?

গ্যালাক্সি জেড ফোল্ড৮-এর প্রারম্ভিক মূল্য ১ হাজার ৮৯৯ ডলার। এমন মূল্যের একটি ফোন কিনতে আগ্রহী ব্যবহারকারীরা সাধারণত মৌলিক কোনো সুবিধায় আপস করতে চাইবেন না। অথচ স্যামসাং তার সবচেয়ে উন্নত ক্যামেরা ব্যবস্থা আরও ব্যয়বহুল ফোল্ড৮ আল্ট্রার জন্য সংরক্ষিত রেখেছে।

বিশেষ করে স্মার্টফোনের বাজারে ক্যামেরা এখন বিলাসিতা নয়, বরং ক্রয় সিদ্ধান্তের অন্যতম প্রধান কারণ। একজন ক্রেতা যখন প্রায় দুই হাজার ডলার ব্যয় করছেন, তখন তিনি স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা করবেন যে ডিভাইসটির ক্যামেরাও কোম্পানির সেরা প্রযুক্তির প্রতিনিধিত্ব করবে।

ফলে ফোল্ড৮ ও ফোল্ড৮ আল্ট্রার মধ্যে পার্থক্য তৈরি করতে গিয়ে স্যামসাং এমন একটি সীমারেখা টেনে ফেলেছে কি না, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ফোল্ড৮-এর মূল্যকে ক্রেতার চোখে দুর্বল করে দিতে পারে—সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

Samsung unveils first multi-folding phone as competition set to heat up |  Bonikbarta

অ্যাপলের প্রবেশ বদলে দিতে পারে বাজারের হিসাব

এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য আরও বড় হয়ে উঠছে সম্ভাব্য নতুন প্রতিযোগিতার কারণে। অ্যাপল যদি প্রত্যাশা অনুযায়ী নিজেদের প্রথম ভাঁজযোগ্য আইফোন বাজারে আনে, তাহলে তাদের পণ্যের অবস্থান নির্ধারণ পুরো বাজারের প্রত্যাশাই দ্রুত বদলে দিতে পারে।

বিশেষ করে অ্যাপল যদি ভাঁজযোগ্য ফোনে ক্যামেরাসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রিমিয়াম বৈশিষ্ট্যগুলোতে কম আপসের পথ বেছে নেয়, তাহলে স্যামসাংয়ের বর্তমান বিভাজন কৌশল নতুন চাপের মুখে পড়তে পারে।

প্রযুক্তি ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, একটি নতুন ধারণা প্রথম বাজারে আনা আর সেটিকে গণমানুষের কাছে অপরিহার্য করে তোলা এক বিষয় নয়। নতুন প্রযুক্তিকে ব্যবহারকারীর দৈনন্দিন অভ্যাসের সঙ্গে যুক্ত করতে পারা শেষ পর্যন্ত বাজারের গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।

হার্ডওয়্যারের লড়াইয়ের পর গল্পের লড়াই

স্যামসাংয়ের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত এখানেই।

ভাঁজযোগ্য ফোনে মাল্টিটাস্কিং করা যায়, বড় পর্দায় ভিডিও দেখা যায়, গেম খেলা সুবিধাজনক, একই সঙ্গে একাধিক অ্যাপ চালানো যায় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর বিভিন্ন কাজও সহজ করা সম্ভব। এসব সুবিধা বাস্তব এবং গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু একজন সাধারণ স্মার্টফোন ব্যবহারকারী কেন তার পরিচিত ফোন ছেড়ে অনেক বেশি দাম দিয়ে একটি ভাঁজযোগ্য ডিভাইস কিনবেন?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু ফিচারের তালিকা দিয়ে দেওয়া কঠিন।

অ্যাপলের দীর্ঘদিনের একটি শক্তি হলো প্রযুক্তিকে প্রকৌশলগত সাফল্যের গল্প হিসেবে উপস্থাপন না করে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের পরিবর্তনের গল্প হিসেবে তুলে ধরা। অ্যাপল যদি ভাঁজযোগ্য ফোন নিয়ে বাজারে আসে, তাহলে তারা সম্ভবত প্রযুক্তিটি কী করতে পারে—তার পাশাপাশি মানুষ কেন সেটি চাইবে, সেই ব্যাখ্যাকে সামনে নিয়ে আসবে।

স্যামসাং প্রকৌশলের ক্ষেত্রে অনেকটাই এগিয়ে গেছে। এখন তাদের প্রতিযোগিতা হবে ব্যবহারকারীর কাছে সেই প্রকৌশলের প্রয়োজনীয়তা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে।

স্মার্টওয়াচেও বদলে যাচ্ছে লক্ষ্য

ভাঁজযোগ্য স্মার্টফোন নতুন পণ্য ঘোষণার কেন্দ্রে থাকলেও স্যামসাংয়ের স্মার্টওয়াচ কৌশলের পরিবর্তনও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

গ্যালাক্সি ওয়াচ আল্ট্রা২ এবং গ্যালাক্সি ওয়াচ৯ দেখাচ্ছে যে স্মার্টওয়াচকে কোম্পানিটি আর শুধু ব্যায়াম কিংবা দৈনিক শারীরিক কার্যক্রম পরিমাপের যন্ত্র হিসেবে দেখছে না। স্বাস্থ্য সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সেই তথ্য বিশ্লেষণ, প্রবণতা শনাক্ত এবং ব্যবহারকারীর জন্য প্রাসঙ্গিক পরামর্শ তৈরির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে প্রযুক্তিটি।

এই পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি মূল্য হয়তো কোনো একটি হার্ডওয়্যার বৈশিষ্ট্যের চেয়েও বেশি।

কারণ স্মার্ট ডিভাইস যদি শুধু বলে দেয় আজ একজন মানুষ কত কদম হাঁটলেন, সেটি এক ধরনের সেবা। কিন্তু সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে যদি তার অভ্যাস সম্পর্কে অর্থবহ ধারণা দিতে পারে এবং স্বাস্থ্যকর পরিবর্তনের পথ দেখাতে পারে, তাহলে ডিভাইসটির ভূমিকা সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে যায়।

Samsung Galaxy Z Fold 8 vs. Z Fold 8 Ultra: The Big Differences After  Trying Out Both Foldable Phones - CNET

শেষ পর্যন্ত লড়াই মূল্য প্রমাণের

সব মিলিয়ে স্যামসাংয়ের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে ভাঁজযোগ্য স্মার্টফোন প্রযুক্তি এখন পরিণত একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফোনগুলো আরও ব্যবহারযোগ্য হয়েছে, পণ্যের পরিসর বিস্তৃত হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে পুরো ইকোসিস্টেমের কেন্দ্রে নিয়ে আসা হচ্ছে এবং স্মার্টওয়াচ থেকে ভবিষ্যতের স্মার্ট চশমা পর্যন্ত একই প্রযুক্তিগত দর্শনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

কিন্তু প্রযুক্তি পরিণত হওয়া আর বাজার পরিণত হওয়া একই বিষয় নয়।

এখন সবচেয়ে বড় বাধা সম্ভবত আর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নয়। প্রশ্ন হলো, ব্যবহারকারীরা এই অতিরিক্ত সক্ষমতার জন্য অতিরিক্ত মূল্য দিতে প্রস্তুত কি না।

ভাঁজযোগ্য ফোনের ভবিষ্যৎ তাই শুধু আরও পাতলা ডিভাইস, শক্তিশালী প্রসেসর, উন্নত হিঞ্জ কিংবা উজ্জ্বল ডিসপ্লের ওপর নির্ভর করবে না। নির্ভর করবে প্রযুক্তিটি মানুষের জীবনে এমন কী মূল্য যোগ করছে, যা প্রচলিত স্মার্টফোন দিতে পারছে না।

স্যামসাং প্রযুক্তিগত ভিত্তি অনেকটাই তৈরি করে ফেলেছে। এখন তাদের সবচেয়ে বড় কাজ হলো সেই প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা প্রতিষ্ঠা করা।

আর অ্যাপল যদি সত্যিই এই বাজারে প্রবেশ করে, তাহলে ভাঁজযোগ্য স্মার্টফোনের পরবর্তী যুদ্ধটি সম্ভবত কে প্রথম প্রযুক্তি তৈরি করেছে তা নিয়ে হবে না; বরং কে সবচেয়ে সফলভাবে মানুষকে বোঝাতে পারে যে এই প্রযুক্তি কেন তাদের জীবনের অংশ হওয়া উচিত—সেটিই হয়ে উঠবে আসল প্রতিযোগিতা।